artk
৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, রোববার ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৫:৫০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বিপ্লবী ক্ষুদিরামের চেতনা, সেফুদা বা হিরো আলমের প্রেক্ষাপট

রিবেল মনোয়ার | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৭১৩ ঘণ্টা, বুধবার ১৫ আগস্ট ২০১৮


বিপ্লবী ক্ষুদিরামের চেতনা, সেফুদা বা হিরো আলমের প্রেক্ষাপট - অসম্পাদিত

সাহসী মানুষেরা নিজেদের কাজ দিয়ে পৃথিবীতে স্থান করে নেয়। আর যারা অনেক বেশি সাহসী মৃত্যুর পরও মানুষ তাদের নাম মনে রাখে। ১১ আগস্ট ১৮ বছর বয়সী বিপ্লবী ক্ষুদিরাম নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাকে নিয়ে কোন ইভেন্ট পেজ আমার চোখে পড়েনি। অথচ ফেসবুকে কয়েক কোটি ইভেন্ট পেজ রয়েছে। আর আমরা তরুণরা সেসব ইভেন্টের অংশীদার। কোথায় যেন একটি বেদনার সুর। সব চেতনা চাপা পড়ছে নতুন ভোগবাদী চেতনার কাছে।

এখন ডিজিটাল যুগে দেশপ্রেমের কথা অনেকের কাছে সেকেলে মনে হতে পারে। অনেক এমবিএ পাস ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে সংসদের স্পিকারের নাম জানতে পারিনি। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নামও তারা জানে না। ব্যতিক্রম আছে, তবে সংখ্যায় কম।

কিন্তু চেতনা কখনো পুরনো হয় না। এটাই সব আধুনিকতার ও শক্তির মূল। এদেশের তরুণদের এখন সবচেয়ে বেশি সময় কাটে ফেসবুকে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশাল’ এবং কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইট একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। অনলাইনে প্রকাশিত চলতি বছরের এপ্রিল মাসের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন ব্যাংককে, ৩ কোটি। এর পরই রয়েছে ঢাকা। এখানে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। তৃতীয় স্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। আমরা ভালো কাজে ১ বা ২ হতে না পারলেও নেতিবাচক সুচক, যেমন- দুর্নীতি, যানজট, ইন্টারনেটের গতি কম, দক্ষ লোকবলের অভাব এসব সূচকে প্রথম দিকেই থাকি।

কিছু সেক্টরে বিশেষত আইটি সেক্টরে কিছু সূচকে উন্নতি শুরু হয়েছে। এটা আশার কথা। দেশে ফেসবুকের প্রভাব এখন সবাই জানি। কিন্ত সে শক্তি কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে?

ফেসবুকে শত বা হাজার বছরের পুরনো কোন আলোচনা সহজে আসে না। কারণ বন্ধুদের সাথে সেলফি,খাবারের ছবি, আইফোন বা স্মার্টফোন দেখানো, মেকাপের প্রতিযোগিতা। কিন্ত হৃদয় আলোকিত করবার জন্য বইয়ের আলোচনা, ভালো মুভি নিয়ে আলোচনা খুব কম মানুষই করে। সেখানে পুরনো বিষয় আসাটা বেশ কঠিন।

ভিতরের চেতনাগুলো শুকিয়ে গেছে সেই কবে। আর রাজনীতি সচেতন অনেকের ফেসবুক ওয়ালে শোভা পায় বর্তমান কালের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারে প্রশংসা সম্বলিত পোস্টার। আলোচনা, পোস্ট বা প্রফাইলে গভীরতা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। কিন্ত হিরো আলম বা সেফুদাকে নিয়ে আলোচনার কমতি নেই। এখানে বিপ্লবীরা অনেক দূরের মানুষ। তাদের আলোচনা এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

জেলখানার ফাঁসির মঞ্চ: দেশপ্রেম নিয়ে একজন মহান মানুষ নিজের জীবনের শেষ সময়টি পার করছে। কিন্ত ১৮ বছরের এক যুবক বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে। তার ফাঁসি হবে। কিন্ত তার একটুও ভয় নেই বরং জগতের সব সাহস যেন তার বুককে ইস্পাত কঠিন করেছে। পৃথিবীর সব বিপ্লবীরা এ ধরনের বুক চিতিয়ে থাকা। ফিলিস্তিনের শিশু হান্দালা যে ট্যাংকের সামনে বুক চিতিয়ে থাকে আর ক্ষুদিরাম বা প্রীতিলতা সবাই যেন একই মন্ত্রে বলীয়ান।

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর পাঁচটায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক যুবককে ফাঁসির মঞ্চে প্রশ্ন করে তার শেষ ইচ্ছে আছে কিনা। অপেক্ষা না করেই নিঃসঙ্কোচিত্তে বলে উঠলেন, ‘আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ উপস্থিত কারা কর্তৃপক্ষ সেদিন বিস্মিত হলো যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ দেখে। ক্ষুদিরাম বসুর জীবন ছোট কিন্তু প্রভাব অনেক বড় (জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯, মৃত্যু ১১ আগস্ট ১৯০৮)।

ক্ষুদিরামের জন্ম ভারতের মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি হাবিবপুর গ্রামে। দিনটি ছিল ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর। কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরামের এমন ব্যতিক্রমী নাম নিয়েও কিন্তু রয়েছে একটি ঘটনা। তাহলে খুলেই বলি, ক্ষুদিরাম বাবা মায়ের চতুর্থ সন্তান। কিন্তু আগের সব ছেলে মারা যাওয়ায় ক্ষুদিরামের জন্মের পর মা খুব ভয় পেয়ে যান, যদি এই ছেলেও মারা যায়! তখন তিনি তিন মুঠো ক্ষুদের বিনিময়ে তারই বড় মেয়ের কাছে ছেলেকে রেখে আসেন। সেই থেকে তার নাম ‘ক্ষুদিরাম’। অথচ তখন কে জানতো এই ছেলে মরে গিয়েও বেঁচে রইবে অনন্তকাল।

ফেসবুকে আসক্ত প্রজন্ম:
আমি তরুণদের সাথে কাজ করি। ফেসবুকে ব্যস্ত প্রায় ১০ জনকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছি ক্ষুদিরাম বসুর কথা। ২ জন মাত্র বলতে পেরেছে তার কথা। যারা বলতে পেরেছে তার একজন পড়েছে বিসিএস গাইডে আর আরেকজন একটি পত্রিকায় পড়েছে। কিন্ত ১১ আগস্ট বা ক্ষুদিরামের চেতনা, দেশপ্রেম এসব বিষয়ে তারা অবগত নয়। বাকি ৮ জন ক্ষুদিরাম নামের সাথে পরিচিত নয়। কিন্ত সব গুজব, স্ক্যান্ডাল, পর্নস্টার, নায়িকা, নায়ক, গায়ক তাদের নাম বেশ মুখস্থ। তারা ক্ষুদিরামকে না চিনলেও পিটবুল ও জাকারবার্গকে চেনে।

আসলে একটি জেনারেশনেরর চেতনা তৈরি হয় তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে। সমাজের ও দেশের নানা অস্থিরতার মাঝখানে সুস্থভাবে চিন্তা করাটা কারো জন্য সহজ নয়। এর ফলাফল তরুণ প্রজন্ম একটা বড় ধরনের গ্যাপ নিয়ে বড় হচ্ছে। কিছুদিনন আগে যে ছাত্র আন্দোলন হলো সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে, তাতে তরুণ প্রজন্ম এমন সচেতনতা দেখে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছি কিন্তু নানারকম বিতর্ক আর গুজবের কারণে সে আন্দোলন এখন অতীতের বিষয়। সবকিছুই এদেশে বিতর্কিত করা যায়। সেটা হোক জীবনের নিরপত্তার ইস্যু, হোক জাতীয় চেতনা। আর গুজব দমনের নামেও চলে গুজবের বিস্তার। এখানে সত্য-মিথ্যা বা চিন্তার করবার সময় মনে হয় কারো নেই। আর যারা চিন্তা করতে পারেন তাদের আফসোস করা ছাড়া কিছু করার নেই।

তরুণরা যখন আন্দোলন করছিলো তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এবার তার পরিবারে সংস্কার করার কথা। পরিবারকে মেরামত না করে তো রাষ্ট্রকে মেরামত করা যাবে না। তার বাবা-মা যে ব্যয় করে তার সাথে আয়ের কতটা মিল আছে সে ব্যপারে খোঁজ নাও। তারা কি ঘুষ খায়। কিন্ত সে ব্যপারে আলোচনা বা আন্দোলন আর অগ্রসর হয়নি। কারণ এটার সুবিধাভোগী পরিবারের সবাই। ঘুষ খেলে ভালো বলার সুযোগ কারো নেই। কিন্তু ঘুষের সুবিধা নিতে তেমন কারো আপত্তি চোখে পড়ে না। ঘুষের টাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল , কলেজ, এতিমখানা, রাজনৈতিক দল মিডিয়া সব গড়ে ওঠে। ফলে এ ব্যপারে সবাই চুপ থাকে।

আমরা একটি সুবিধাভোগী প্রজন্ম তৈরি করছি কিনা ভাবতে হবে। এসি রুমে বসে জীবন পার করে। গেমস, কম্পিউটার আর স্মার্টফোনে যাদের জীবন সীবাবদ্ধ, তারা কি ক্ষুদিরামকে দেখতে পায়? যারা কোনদিনে নদীর তীরে পানিতে সাঁতার কাটেনি। যাদের চুল লিলুয়া বাতাসে এলোমেলো হয়ে চোখ ছুঁয়ে যায়নি। তাদের মনে কি ক্ষুদিরামের চেতনা ছুঁয়ে যায়?

রিবেল মনোয়ার: সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য