artk
৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৭:০১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

আদরে আদরে শিশুকে বাঁদর বানাবেন না, প্লিজ!

কাজী তাহমিনা | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৮৩৬ ঘণ্টা, শনিবার ২৮ জুলাই ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৮৩৬ ঘণ্টা, শনিবার ২৮ জুলাই ২০১৮


আদরে আদরে শিশুকে বাঁদর বানাবেন না, প্লিজ! - অসম্পাদিত
কাজী তাহমিনা

আমার পর্যবেক্ষণ বলে, আমাদের দেশে নানা ধরণের বাবামায়ের মধ্যে এক্সট্রিম তিন ধরণের বাবা মা আছেন।

একদল শিশু পেটানোর ওস্তাদ- তারা শিশুদের মোটামুটি প্রোগ্রামড রোবট এবং যে কোন মূল্যে অর্থকরী বিনিয়োগ বানাতে চান (ডাক্তার /ইঞ্জিনিয়ার /কর্পোরেট /আমলা ইত্যাদি= টাকা আনয়নকারী কামলা) এবং শিশু সেদিকে আগ্রহী না হলেই, পান থেকে চুন খসলেই বেধড়ক পিটুনি দিয়ে 'সব মুশকিল আসান' করতে চান। তারা নিজেদের সমস্ত অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের বেসামাল বোঝা চাপিয়ে দেন শিশুর কাঁধে, আর নিজেদের রাগ, ক্ষোভ, ক্ষত, ব্যর্থতার জ্বালাও মিটান শিশুর ছাল তুলে!

আর একদল আছেন, মোটামুটি সব ব্যাপারেই উদাসীন। তারা কিছুটা 'মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি' নীতিতে বিশ্বাসী। জন্ম দিয়েই তারা বর্তে যান এবং মোটামুটি শিশুকে 'চলছে গাড়ি, যাত্রাবাড়ী ' স্টাইলে বড় হতে দেন।

সর্বশেষ এবং তৃতীয় দলটিকে নিয়েই আপাতত আমার বেশি আশংকা। এই দলটি আজকাল আকারে, সংখ্যায় মহামারী আকার ধারণ করছে এবং শিশুপালনের নামে আদিখ্যেতা এবং বিকারের চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

এরা আদরের নামে শিশুকে 'চাহিবামাত্র সবকিছু পাইবে'/'চাহিবার পূর্বেই পাইয়া যাইবে' নীতিতে অভ্যস্ত করে পরনির্ভরশীল, ন্যাকা, অকেজো, অলস এক একটি অথর্ব তৈরি করছে।

এই শ্রেণীর বাবা মায়েরা শিশুকে শিশুকাল হতে বুড়োকাল পর্যন্ত 'বুড়ো খোকা/খুকী 'করে রাখেন, কুটোটা নাড়াতে দেন না, কোন কাজ শেখান না এবং আদতে সন্তানকে স্বনির্ভর হতে না শিখিয়ে/ বৃহত্তর জীবনের জন্য প্রস্তুত না করে, সন্তানদের এক একটি ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে বসিয়ে রাখেন।

এদের আচরণে মনে হয়, এই মনুষ্যধামে শত শতাব্দী পরে একটিমাত্র মনুষ্য শিশুই ('ফিনিক্স পাখির মত দুষ্প্রাপ্য) অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটিকে তুলোয় মুড়ে তুলতুলে করে রাখতে হবে আর জগতের বাকি সব প্রাণী ও মানুষ এদের তুলনায় তুচ্ছ!

এই ধরণের পিতা মাতার পুত্র কন্যারা কখনো রান্নাঘরে যান না, বাজারঘাট চেনেন না, নিজের কাপড় নিজে কাঁচলে/নিজের কাজ নিজে করলে তাদের জাত যায়, নিজের ঘরদোর গোবর হয়ে থাকলেও তারা কুটোটি নাড়ান না এবং বেলা এগারোটা কি বারোটায় গাত্রোত্থান করে, বিছানা থেকে বহুকষ্টে নিজেকে নামিয়ে ষাট বছরের বাবার আনা বাজারে, ঊনষাট বছরের বৃদ্ধ মায়ের তৈরি করা ব্রাঞ্চ খেয়ে দুনিয়া উদ্ধার করেন! ঘরের ভেতর বাবা, মা, ভাইবোন, ঘরের বাইরে পুরো দুনিয়া উল্টে গেলেও তারা তাদের নিজ নিজ আত্মকেন্দ্রিক জগতের বাইরে আসতে পারেন না, অন্যের জন্য কিছু করা তো-'বহুত দূর কী বাত'!

নিজের ঘরে ল্যাপটপ কি মোবাইল ফোনে তাদের অনেকেই সারাক্ষণই প্রেজেন্টেশন কি এসাইনমেন্টের নামে ফেসবুক/ইন্সটা/খুচরো প্রেম চালাতে থাকেন, ক্ল্যাশ অভ ক্ল্যান্স কি গেইম অভ থ্রোনস চালাতে থাকেন অথবা ফেসবুকীয় বিপ্লবে দেশোদ্ধার করতে থাকেন এবং বৃদ্ধ বাবা মা ভাবতে থাকেন, ঘরে ঘরে এক একটি বিদ্যাসাগর তৈরি হচ্ছে!

এই চিন্তাহীন, পরনির্ভরশীল, অলস, ন্যাকা, প্রেমকুমার, প্রেমকুমারী প্রজন্ম (অবশ্যই সবাই নয়) তৈরিতে/হয়ে ওঠায় সন্তানদের দোষ যদি থাকে-পঁচিশ ভাগ, বাকি পঁচাত্তর ভাগ দোষই আমি বলবো, বাবা মায়ের।

তারাই আদর ও শাসনের সমন্বয় করতে ভুলে যাচ্ছেন - সন্তানের জন্য অতিমাত্রায় সুখ/স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করছেন এবং সন্তানদের ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে/নিজের কাজ নিজে করতে শিখতে এবং দায়িত্বশীল হতে দিচ্ছেন না।

আমার পরিচিত বেশ কিছু ছেলেমেয়ে এতো বাড়াবাড়ি আদর পেয়েছে /মনোযোগ পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ছোটবেলা থেকে, যে তারা পরবর্তীতে প্রচণ্ড মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ম্যানিপুলেটিভ আচরণ করছে বাবা মার সাথে।

বাবা মার প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতিশীল/দায়িত্বশীল হওয়া তো দূরের কথা- তারা অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা মাকেও চব্বিশ ঘণ্টা খাটিয়ে মারে- সবকিছু রেডিমেড না পেলে খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু এইসকল অসংবেদনশীল, দায়িত্ববিমুখ শিশুরা একদিনে দায়িত্বহীন হয়ে বেড়ে ওঠে না। দিনের পর দিন তাদের কায়িক শ্রমকে, নিজের কাজ নিজে করাকে ঘৃণা করা শেখানো হয়। রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ বেসিক সারভাইভাল স্কিলগুলো শিখতে উৎসাহিত করার বদলে, এগুলোকে 'ছোটলোকের কাজ'/'বুয়া/দারোয়ান/চাষার কাজ' বলে অবহেলা/ঘৃণা করতে শেখানো হয়।

আমার চোখের সামনে আরো দেখেছি, 'শিক্ষিত/ডিগ্রিধারী/ভালো পদে অবস্থানকারী বাবা মায়েরা, শুধু অধীনস্থ কর্মচারী বা গৃহকর্মী বা সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থানে 'তথাকথিত' নিম্নধাপের লোকজনের সাথে ব্যবহারের বেলায় বাচ্চাদের সামনেই বাজে উদাহরণ তৈরি করেন।

চেনাজানা অনেক লোকজনকে দেখেছি, যখন তারা তাদের অফিসের সাহায্যকারী, ব্যক্তিগত গাড়ীচালক, বাড়ির কাজে সাহায্যকারী মানুষদের সম্পর্কে কথা বলেন, তখন মনে হয়, তারা 'মানুষ' নিয়ে কথা বলছেন না, তেলাপোকা কিংবা মনুষ্যেতর কোন কীটপতঙ্গ নিয়ে কথা বলছেন!

'এইগুলা'/'চাকরবাকর শ্রেণী'/'বদগুলা'/'ফকিন্নিগুলা'- এইসব হচ্ছে তাদের ব্যবহৃত বিশেষণ!
এবং তারা আশা করে থাকেন যে, তাদের 'কেনা গোলাম'রা রোবটের মত ক্লান্তিহীন এবং দাসানুদাস হবে, চব্বিশঘণ্টাই সার্ভিস দেবে, অহোরাত্র তাদের হুজুর হুজুর করবে।

এই যে, যারা মানুষের সাথে এমন ব্যবহারকে জায়েজ এবং উপযুক্ত মনে করেন, তারাই আবার ভুলে যান, যে, সম্মান একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। সম্মান পেতে হলে, সম্মান দিতে জানতে হয়- মানুষ হিসাবে প্রত্যেক মানুষের যে সম্মান প্রাপ্য- তাদের কাছ থেকে ছেলেমেয়েরা কি শিখবে?

আমার এক পরিচিতজনের বাচ্চা তাদের গৃহকর্মে সহায়তাকারী মেয়েটিকে যখন তখন মারে। কিন্তু বাবা বা মা কেউই খুব জোর গলায় বাচ্চাটিকে কিছু বলেন না- বা খুব একটা কাউন্সেলিং করেন না।

আমাদের দেশের অনেক বাবা মায়েদেরই প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ দরকার। শিশুকাল থেকেই যদি শিশুদের আমরা স্বনির্ভর হতে সাহায্য করি, নিজের কাজটা নিজে করায় উৎসাহিত করি, ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করি, মন্দ কাজে মৃদু এবং পরিমিত তিরস্কার করি, ছোটখাটো কাজ যেমন- ভাইবোনকে পড়ালেখায় সাহায্য করা, বেবিসিটিং করা, টুকটাক রান্নাবান্না করা, বাবা মাকে কাজে সাহায্য করা ইত্যাদির বিনিময়ে পকেট মানি দিই, উৎসাহিত করি- তাহলে শিশুরা দায়িত্বশীল হতে শিখবে।

আসুন, এক একটি আদরে বাঁদর, ন্যাকা না বানিয়ে, স্বনির্ভর, পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য উপকারী ও দরকারি একটি প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা চালাই।

হ্যাপি প্যারেন্টিং!

বিঃদ্রঃ আরো অনেক ধরণের বাবা মা আছেন, যারা খুবই ব্যালেন্সড এবং অন্যদের জন্য অণুকরণীয়। তবে তারা আজকে আমার আলোচনার বিষয়বস্তু নন।

আবার, ঠিকঠাক প্যারেন্টিংও কাজ নাও করতে পারে!

একই প্যারেন্টিং নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরাও ভিন্নরকম ভিন্নরুচির হতে পারে। এক্সটারনাল অনেক ফ্যাক্টর আছে।

সেগুলোর কোনটাই আজকের আলোচ্য বিষয় নয়!
আজকের বিষয়- অতি আদরে বাঁদর!

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য