artk
৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ১:২৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

গৌরীপুরে টেন্ডার ছাড়াই বিদ্যালয়ের ভবন ও গেট নির্মাণ!

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৮৫২ ঘণ্টা, রোববার ১৫ জুলাই ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২১০০ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই ২০১৮


গৌরীপুরে টেন্ডার ছাড়াই বিদ্যালয়ের ভবন ও গেট নির্মাণ! - জাতীয়

মায়ের অপরাধে মেয়েকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া এবং ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ-মামলার আসামি হওয়ার পর আবারও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েছেন ময়মনসিংহের গৌরীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-দপ্তর সম্পাদক এনামূল হক সরকার।

এবার কোনো প্রকার টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়ের ভবন ও গেট নির্মাণ করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, নতুন ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রজাতির বিশাল কয়েকটি গাছ কেটে নিয়েছেন তিনি।

অপরদিকে, প্রকল্প কমিটি গঠন করা হলেও নির্মাণ কাজের কোথায় কত টাকা ব্যয় হচ্ছে সে বিষয়ে কোনো তথ্যই দিতে পারেননি প্রকল্প কমিটির লোকজন। কারণ, প্রধান শিক্ষক প্রভাব খাটিয়ে সব টাকা নিজের হাতে খরচ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবন নির্মাণ কমিটির প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য নূর মোহাম্মদ ফকির বলেন, “আমি ভবন নির্মাণ কাজের প্রধান হলেও টাকার হিসাব প্রধান শিক্ষকের কাছে রয়েছে। যত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেটা উনি নিজের হাতেই করেছেন। আর সরকারি অনুমতি ছাড়া যদি উনি গাছ কেটে থাকেন তাহলে এটা উনি কিভাবে করেছেন সেটা উনিই বলতে পারবেন। আমি ভবন নির্মাণের হিসাব চেয়েছি। হাতে পাওয়ার পর বলতে পারবো কত টাকা খরচ হয়েছে।”

এদিকে, স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে গৌরীপুর পৌর শহরের কালীপুর মধ্যম তরফ এলাকার ছয়গণ্ডা মৌজায় পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ২০১০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন এনামূল হক সরকার। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১ হাজার ১৩০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে।

শিক্ষার্থীদের পাঠদান ভবন সঙ্কটের কারণে ২০১৭ সালে মার্চে বিদ্যালয়ের নতুন পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন প্রধান শিক্ষক। এরপর ২০১৮ সালের জুন মাসে আবারও টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যালয়ে প্রবেশ পথে পাকা গেট নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি।

নির্মাণ কাজ শেষের পথে ওই ভবনে ইতোমধ্যে ৩৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অপরদিকে, প্রবেশ পথের গেট নির্মাণে ৪ লাখ টাকা খরচ হবে বলে জানিয়েছেন তিনি (প্রধান শিক্ষক) নিজেই।

যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত বিধি-বিধান ও পরিপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বাবদ বেশি অংকের টাকা খরচের জন্য (যথা: বিল্ডিং, আসবাবপত্র, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির জন্য খরচ ইত্যাদি) খবরের কাগজে দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করতে হয় এবং দরপত্র পরিচালনা কমিটি কর্তৃক অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যাদেশ দিতে হয়।

কিন্তু প্রধান শিক্ষক সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রকার টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই ভবন ও গেট নির্মাণের কাজ শুরু করলে তার বিরুদ্ধে টাকা হাতিয়ে নেয়া, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে।

রোববার দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। ভবনটিতে পাঁচটি পাঠদান কক্ষ, একটি ডিজিটাল ল্যাব, একটি অফিস কক্ষ একটি নামাজখানা আছে।

অপরদিকে, প্রবেশ পথের গেটের নির্মাণ কাজ অর্ধেক শেষ হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে প্লাস্টার, ফিনিশিং ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। তবে নির্মাণ কাজের এসব ঘটনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল আলম অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার কমল কুমার রায়কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

স্থানীয় ও অভিভাবকরা জানান, ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টির তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ডা. ক্যাপ্টেন মজিবুর রহমান ফকির প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে তাকে (প্রধান শিক্ষক) অপসারণে বিদ্যালয়ে গণভোটের আয়োজন করেন। তখন শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষককে অপসারণের জন্য ভোট দিয়েছিল। কিন্তু মজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রধান শিক্ষককে অপসারণের প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়। এরপর তিনি আবারও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে খবরের কাগজে শিরোনাম হয়েছেন। সর্বশেষ গত জুন মাসে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে অনিয়ম ও গোপনে তফসিল ঘোষণার কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন জুয়েল বলেন, “প্রধান শিক্ষক এনামূল হক সরকার উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হয়েও দলীয় কর্মসূচিতে আসেন না। কিন্তু দলের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে স্কুলে নানা রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। নিজের সুবিধার জন্য তিনি নির্বাচন না দিয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে সেখানে জামায়াত-বিএনপির লোকজনকেও জায়গা দিয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডে দল ও স্কুলের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। দলীয় নেতা নয়, একজন অভিভাবক হিসেবে আমি এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করে স্কুলের সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি।”

অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক এনামূল হক সরকার বলেন, “স্কুলের উন্নয়ন কাজে কোনো রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। ম্যানেজিং কমিটির সাথে পরামর্শ করেই টেন্ডার ছাড়া ভবন ও গেট নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণে ইতোমধ্যে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আর গেটের জন্য ৪ লাখ টাকা। ভবন নির্মাণের সময় দুটি রেইনট্রি গাছ কাটা হয়েছে। এগুলো দিয়ে স্কুলের বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে।”

এদিকে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল আলম এ বিষয়ে বলেন, “টেন্ডার ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যান্য অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/আরআইআর/এসডি

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য