artk
৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, রোববার ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৬:৪৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ইন্টারনেট ভ্যাট কমানো নিয়ে ভানুমতির খেল!

স্টাফ রিপোর্টার | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২২০০ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ০৫ জুলাই ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৪৪৫ ঘণ্টা, শুক্রবার ০৬ জুলাই ২০১৮


ইন্টারনেট ভ্যাট কমানো নিয়ে ভানুমতির খেল! - বিশেষ সংবাদ

সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে নাগরিকদের কাছে সুলভমূল্যে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর সে কারণেই ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারনেট সেবার ওপর থেকে সব ধরনের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

অর্থমন্ত্রী প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন ভ্যাট কমানোর। মোস্তাফা জব্বার তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, আমার প্রথম কাজই হবে ইন্টারনেটের দাম কমানো।

কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যায়, অর্থমন্ত্রী ইন্টারনেট সেবার ওপর থেকে এক পয়সাও ভ্যাট কমাননি।

এতে ব্যবসায়ীরা আশাহত হয়ে প্রযুক্তি মন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। অনেক দেন দরবারের পর অবশেষে ইন্টারনেটের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট মওকুফ করা হয়। বাজেটেও তা পাস করা হয়।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ১০ শতাংশ ভ্যাট কমানোর পর যেভাবে বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে, তাতে কি ইন্টারনেটের দাম কমবে? এটা নিয়ে কি হিসাব নিকাশ করা হয়েছে?

ইন্টারনেট সেবায় ভ্যাট বিধিমালায় যেভাবে সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ভ্যাট কমানোর নামে এ এক ভানুমতির খেল!কারণ ভ্যাট কমানো হলেও বিধিমালা অনুযায়ী ইন্টানেটের দাম কমার বদলে বেড়ে যাবে। অন্যদিকে সরকারি খাতেও জমা হবে কম অর্থ।

জেনে নেয়া যাক ১০ শতাংশ ভ্যাট কমানোর পরও কিভাবে ইন্টারনেটের দাম বাড়ে।

হিসাব বলছে, নতুন নিয়মে একজন গ্রাহককে ১০০ টাকা ভিত্তি-মূল্যে মাসিক বিলে আগের চেয়ে বাড়তি দিতে হবে ১.৫০ টাকা। আবার গ্রাহকের দেয়া বর্ধিত ইন্টারনেট বিল থেকে সরকারি খাতেও জমা হবে আগের চেয়ে সাড়ে আট টাকা কম! তাহলে গ্রাহকের দেয়া বাড়তি টাকা যাচ্ছে কোথায়? আর সরকার যে টাকাটা কম নিচ্ছে সেটার গন্তব্যই বা কোথায়?

ইন্টারনেট সেবার মূল কাঁচামাল বা উপকরণ হচ্ছে ব্যান্ডউইথ। এই ব্যান্ডউইথই কয়েক হাত ঘুরে প্রসেসড হয়ে গ্রাহকের কাছে ‘ইন্টারনেট সেবা’ হিসেবে পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়ায়, মূলত তিনটা পক্ষ জড়িত –

১) IIG (International Internet Gateway) – এর ফাংশন হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ কিনে তা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছে রাউট করা।

২) NTTN (National Telecommunication Transmission Network) – এদের স্থাপিত ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই ব্যান্ডউইথ IIG থেকে ISP পর্যন্ত এবং ISP থেকে গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছায়।

৩) ISP (Internet Service Provider) – এরা মূলত ব্যান্ডউইথকে ইন্টারনেট সেবায় রুপান্তর করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। একজন গ্রাহকের (End User) জন্য ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ ও মূল্য-পরিশোধের Single Point of Contact হচ্ছে এই ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলো।

আগের নিয়মে আইএসপির কাছে আইআইজির বিক্রি করা ব্যান্ডউইথের বিক্রয়মূল্যের সাথে ১৫% ভ্যাট যোগ করতে হতো। একইভাবে NTTN এর ট্রান্সমিশন চার্জের সাথেও আরো ১৫% ভ্যাট যোগ করতে হতো। ভিত্তি মূল্য ১০০ টাকা ধরলে, হিসাবটা দাঁড়াত এরকম –

IIG এর ব্যান্ডউইথ মূল্য ১০০ টাকা + ১৫% ভ্যাট ১৫ টাকা= IIG থেকে ব্যান্ডউইথ ক্রয়মূল্য ১১৫ টাকা

আবার, NTTN এর ট্রান্সমিশন চার্জ ১০০ টাকা + ১৫% ভ্যাট ১৫ টাকা = ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন খরচ ১১৫ টাকা

এক্ষেত্রে, ISP’র জন্য ব্যান্ডউইথের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হওয়ার কথা (১১৫+১১৫) = ২৩০ টাকা। কিন্তু ব্যান্ডউইথ এবং ট্রান্সমিশনের জন্য প্রদত্ত মূসকে রেয়াত প্রযোজ্য হওয়ায়, প্রকৃত ক্রয়মূল্য কমে দাঁড়াত ২০০ টাকা। আইএসপি এই ক্রয়মূল্যের সাথে অপারেশনাল কস্ট, মুনাফা ইত্যাদির জন্য সাধারণত সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের ৩৩.৩৪% বা ৩ ভাগের ১ ভাগ মূল্য সংযোজন করে গ্রাহকের জন্য ইন্টারনেট সেবার ভ্যাটপূর্ব বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করত। তারপর উক্ত বিক্রয়মূল্যের উপরে ১৫% ভ্যাট যুক্ত হতো। সেই নিয়মে সর্বশেষ হিসাবটা হতো নিম্নরূপ –

ব্যান্ডউইথের ক্রয়মূল্য (ট্রান্সমিশন সহ) - ২৩০ টাকা - ভ্যাট রেয়াত ৩০ টাকা = রেয়াত পরবর্তী ক্রয়মূল্য ২০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হবে ৩৩.৩৪% মূল্য সংযোজন ১০০ টাকা

তার মানে ভ্যাটপূর্ব বিক্রয়মূল্য ৩০০ টাকা + ১৫% ভ্যাট ৪৫ টাকা

ফলে ইন্টারনেট সেবার চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য = ৩৪৫ টাকা

অর্থাৎ ১০০ টাকা ভিত্তিমূল্য সাপেক্ষে, এই ৩৪৫ টাকা ইন্টারনেট সেবার মূল্য হিসেবে গ্রাহকরা পরিশোধ করতেন। এর মধ্যে ৩০০ টাকা আইএসপি তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা করত এবং বাকি ৪৫ টাকা তারা গ্রাহকের পক্ষ থেকে ভ্যাট হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা করত।

সহজ করে বলতে গেলে, আগের নিয়ম অনুযায়ী:
গ্রাহক পরিশোধ করতেন ৩৪৫ টাকা। ভ্যাট বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় হত ৪৫ টাকা

কিন্তু কী ঘটবে নতুন নিয়মে?

এনবিআর এর জারি করা প্রজ্ঞাপনে, ইন্টারনেট সেবার তিনটি ধাপের মধ্যে দুটিতে ভ্যাটের হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা হয়েছে আর অবশিষ্ট ধাপটিতে মূসকের হার অপরিবর্তিত রয়েছে। সেই সাথে আইএসপির জন্য প্রযোজ্য ভ্যাট রেয়াতের বিধানও বাতিল করা হয়েছে। IIG এর ব্যান্ডউইথ মূল্যে ১৫% এর স্থলে ৫%; ISP’র চূড়ান্ত বিক্রয় মূল্যে ১৫% এর পরিবর্তে ৫% মূসক নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, NTTN এর ট্রান্সমিশন চার্জের ক্ষেত্রে পূর্বের ১৫% ভ্যাটই বহাল রয়েছে। এবার দেখা যাক নতুন নিয়মে চুড়ান্ত হিসাবটা কি দাঁড়াচ্ছে-

IIG এর ব্যান্ডউইথ মূল্য ১০০ টাকা + ৫% ভ্যাট ৫ টাকা = IIG থেকে ব্যান্ডউইথ ক্রয়মূল্য ১০৫ টাকা

আবার, NTTN এর ট্রান্সমিশন চার্জ ১০০ টাকা + ১৫% ভ্যাট ১৫ টাকা = ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন খরচ ১১৫ টাকা

নতুন নিয়মে, কোন রেয়াত না থাকায় আইএসপির জন্য ব্যান্ডউইথের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হবে (১০৫+১১৫) = ২২০ টাকা। এক্ষেত্রে, আইএসপি, নতুন প্রজ্ঞাপণের ক্রমিক ‘অ (S০১২ S১২.১৪)’ অনুযায়ী, প্রাপ্ত সমুদয় অর্থের ৩৩.৩৪% মূল্য সংযোজন করতে পারবে কিন্তু ভ্যাট যুক্ত হবে ১৫% এর পরিবর্তে মাত্র ৫%। কাজেই পরিবর্তিত নিয়মানুযায়ী, ইন্টারনেট সেবার চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য হবে–

ব্যান্ডউইথের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ২২০ টাকা + ৩৩.৩৪% মূল্য সংযোজন - ১১০ টাকা = ভ্যাট-পূর্ব বিক্রয়মূল্য ৩৩০ টাকা

ভ্যাট ৫% (৩৩০ x ৫%) ১৬.৫০ টাকা

ইন্টারনেট সেবার চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য ৩৪৬.৫০ টাকা

সুতরাং সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী ভ্যাটের হার কার্যকরী হলে, গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে ৩৪৬.৫০ টাকা।

ভ্যাট থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হবে ৩৬.৫০ টাকা (রেয়াত না থাকায়, IIG ৫ টাকা + NTTN ১৫ টাকা + ISP ১৬.৫০ টাকা)!

ফলে দেখা যাচ্ছে, আইএসপির জন্য প্রযোজ্য ভ্যাট রেয়াতের বিধান বাতিল করায় ভ্যাট কমালেও ইন্টারনেটের দাম কমবে না বরং বাড়বে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত