artk
৫ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ১৯ জুন ২০১৮, ২:৪৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ধারাবাহিক দরপতনে অর্থ খোয়াচ্ছে বিনিয়োগকারীরা

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান, স্টাফ রিপোর্টার | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২০২৫ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১৫ মে ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৮৩৮ ঘণ্টা, বুধবার ১৬ মে ২০১৮


ধারাবাহিক দরপতনে অর্থ খোয়াচ্ছে বিনিয়োগকারীরা - অর্থনীতি

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চলতি বছরে ধারাবাহিক দরপতনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নতুন করে অর্থ হারাচ্ছে। দীর্ঘ ছয় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে বছরে যেতে না যেতেই ফের সূচক ধসের কারণে আবারও অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা। ফলে সামনে আরো অর্থ হারাবে এমন সন্দেহের দানাও বেঁধেছে বিনিয়োগকারীদের মনে। তবে এ ধরনের সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, দরপতনে আতঙ্কিত হওয়ার মতো এখনও কিছু হয়নি।

ডিএসইর সূত্রে জানা যায়, শেয়ারবাজার আগের বছরের চেয়ে লেনদেনে চলছে মন্দা। সবমিলিয়ে লেনদেন ও সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এধারায় চলতি বছরেই লেনদেন সাড়ে তিনশত কোটি টাকার ঘরে চলে এসছে। যা আগের বছরের লেনদেন গড় ছিল সাড়ে ৮শত কোটি টাকার ঘরে। চলতি বছরের এ পযর্ন্ত প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পতন হয়েছে ৬৯৬ পয়েন্ট। অপর সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯০ পয়েন্ট ও ডিএসই-৩০ সূচক ২১১ পয়েন্ট কমেছে। চলতি বছরেই অধিকাংশ মৌলভিত্তিক কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুদের হার বেশি। তাই লাভের আশায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আসছে না। ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে শেয়ারবাজার। সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, সুদের হার ২ ডিজিট থেকে একক ডিজিটে আনবে। তবে এখনও আনা হয়নি। বর্তমানে সুদের হার ২ ডিজিটের ঘরেই রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, আমাদের দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তারল্য সংকট, এটা নতুন কিছু না। বর্তমানে এ সংকট এতো বেশি নয়, যে শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস হবে। এক চক্র এ সংকটকে পুঁজি করে ফায়দা হাসিল করার লক্ষ্যে শেয়ারবাজার পরিবেশ অস্থিতিশীল করছে। এরপর শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ কমাকে কেন্দ্র করে এক অস্থির অবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহসহ দর উঠা নামার গুজবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

এছাড়া নামমাত্র কোম্পানিতে আইসিবির বিনিয়োগ নিয়ে শেয়ারবাজারে নানা প্রশ্নে জন্ম দিয়েছে। এসব কারণে বর্তমান শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক পতন হচ্ছে।

ডিএসইর সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, “শেয়ারবাজার একতরফা সূচক পতন যেমন খারাপ ইঙ্গিত দেয়, তেমনি ধারাবাহিক সূচক বাড়াও ভালো ইঙ্গিত নয়। আসলে বাড়া-কমার কম্পন থাকতে হবে। বাড়ার সঙ্গে কমার সামঞ্জস্যও থাকতে হবে। যাতে শেয়ারবাজারে স্বাভাবিক ব্যালেন্স না হারায়।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে শেয়ারবাজারে ধস উল্লেখ করে শাকিল রিজভী বলেন, “পূর্বে সুদের হার একক ডিজিটে ছিল। তাই বেশি মুনাফা লাভের আশায় শেয়ারবাজারের ঝুকে ছিল অনেকেই। কিন্তু এবারে সুদহার দুই ডিজিটে হওয়ার সবাই শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগ ওঠানোর প্রবনতা দেখা গেছে। এ কারণে শেয়ারবাজার বিনিয়োগে অনেকের আগ্রহ কমে গেছে। এধারায় শেয়ারবাজারে ধস চলছে। ধস কমাতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজারের অবস্থা ঘুরে যাবে।”

বিভিন্ন কোম্পানির নেতিবাচক আয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ব্যবসায় লাভ লোকসান থাকবে। তবে এর সাথে ধারাবাহিক পতনের যৌক্তিকতা নেই।” শেয়ারবাজারের দরপতন প্রসঙ্গে সাবেক সভাপতি বলেন, “শেয়ারবাজারের দর কখনো স্থির অবস্থায় থাকে না। এ বাজারের ধর্ম শেয়ারদর ওঠানামা করা। একথায় কোম্পানির শেয়ার দরে ভাইব্রেট থাকতে হবে।”

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের ঊর্ধ্বগতির পর চলতি বছরের শুরু থেকেই শেয়ারবাজারের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এমন সন্দেহের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় মন্দার পর গত বছর শেয়ারবাজার চাঙ্গা হলেও চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজার নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারে।

শেয়ারবাজার দরপতনের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির নেতিবাচক আয় প্রকাশ হচ্ছে। এছাড়া ব্যাংক সুদের হার এখনও ২ ডিজিট। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ফলে চলতি মাসের শুরু থেকেই শেয়ারবাজারে সূচকে ধস থামানো যাচ্ছে না। দরপতনের আতঙ্কে এসময় শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে।

শেয়ারবাজারের আতঙ্কের গুজব ছড়ানো এমন প্রসঙ্গে টেনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ বলেন, “একটি চক্র শেয়ারবাজারে গুজব ছড়িয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। ওই চক্রটি এখন কম দামে শেয়ার ক্রয় করে, পরে বেশি দামে বিক্রয় করার চেষ্টা করছে। তাই আতঙ্কিত হয়ে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রয় করে দেয়া উচিত হবে না।”

শেয়ারবাজারের তালিকাভূক্ত ৫ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ জানান, “শেয়ারবাজার বর্তমানে এক করুন পরিস্থিতি পার করছে। এই বাজারে এখনও চলছে অর্থ হাতানোর দৃশ্য। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিৎ তাদের ভালো মন্দ বোঝা। এ শেয়ারবাজারে বুঝেশুনে বিনিয়োগ করা।”

সরেজমিনে রাজধানীর মতিঝিলের কয়েকটি সিকিউরিটিজ হাউজ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ব্যাংকের অতিরিক্ত সুদের হারসহ কোম্পানিগুলোর আয়ের নেতিবাচক ইস্যুকে পুঁজি করে একটি শ্রেণি শেয়ারবাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তাই আশাহত বিনিয়োগকারীরা তাদের আতঙ্কের কথা জানান নিউজবাংলাদেশকে।

এ প্রসঙ্গে লংকাবাংলা, ব্র্যাক ইপিএল ও ধানমন্ডি সিকিউরিটিজ হাউজের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির নেতিবাচক ইপিএস আতঙ্কে মার্কেটের ওপর বিনিয়োগকারীরা ভরসা হারাচ্ছে। আবার চলতি বছরে ধারাবাহিক মন্দার কারণে যারা গত বছরের শেষদিকে মুনাফা করেছেন তারা বিনিয়োগে ফিরছেন না। এক কথায় অতীতে যারা লাভবান হয়েছেন তারা এখন শেয়ার কিনছে না আতঙ্কের কারণে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন কিছুতেই যেন আস্থা রাখতে পারছে না বাজারের ওপর।

ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিএসই) মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, “তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয় কম বেশি হতেই পারে। তবে শেয়ারবাজারে কোন সংকট নাই। যা আছে, তা কৃত্রিম সংকট। যা কেটে যাবে। অচিরেই শেয়ারবাজারও ঘুরে দাঁড়াবে।”

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু আহমেদ বলেন, “শেয়ারবাজারে শেয়ার দরে উত্থান-পতন থাকবে। এতে ভয়ের কিছু নেই।” বর্তমান বাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চলতি বছরে সূচক ডিএসইএক্স প্রায় সাতশত পয়েন্ট কমেছে। এধরনের পতনের পর নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেবে, এটাই স্বাভাবিক।”

তবে এমন বাজারে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এএইচকে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য