artk
৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ৭:২৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

একজন অভিনেতা, নাট্য নির্দেশক ও নাট্যকার মোহাম্মদ আমিন

মানিক বাহার | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২১০৪ ঘণ্টা, রোববার ১৫ এপ্রিল ২০১৮


একজন অভিনেতা, নাট্য নির্দেশক ও নাট্যকার মোহাম্মদ আমিন - বিনোদন
মোহাম্মদ আমিনের সঙ্গে লেখক (ডানে)

নাটক নিয়েই পড়ে থাকবেন এমনটা কখনই ভাবেননি। কিন্তু সেই নাটকই তাকে আঁকড়ে ধরে আছে তিন দশকের বেশি সময় ধরে। হবেই বা না কেন? নিজের ঘরেই যে নাটকের শুরু। স্কুল জীবন থেকেই তার পড়ার ঘরে পাড়ার বড়দের নাটকের রিহার্সেল হতো। খুব মজা করে বন্ধুদের নিয়ে দেখতেন সেই রিহার্সেল। কখন যে নিজের ভিতরে তা অনুপ্রবেশ করলো বুঝতেই পারেননি। তারপর বন্ধুদের সাথে নিজেও জড়িয়ে পড়লেন পাড়ার নাটকে। শুরুটা এভাবেই।

নাটক অন্তঃপ্রাণ মোহাম্মদ আমিন মঞ্চ ও টেলিভিশনের একজন দক্ষ অভিনেতা, মঞ্চ নাটক নির্দেশক এবং নাট্যকার। আশির দশকের মাঝামাঝি যৌবনের দীপ্ত চেতনায় বন্ধুদের নিয়ে গাইবান্ধায় গড়ে তোলেন নাট্যদল পদক্ষেপ। এখন সারাদেশে পরিচিত একটি নাট্যদল। নব্বইয়ের উত্তাল সময়ে গাইবান্ধায় প্রথম স্বৈরাচার বিরোধী নাট্য আন্দোলনে নির্দেশক হিসেবে মঞ্চে এবং রাস্তায় তুলে আনেন মাসুম রেজার ‘কাকলাস’। হুলিয়া জারি হয় তার ওপর।

গ্রুপ থিয়েটারভিত্তিক অভিনীত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে পাতালে হাসপাতালে, মেশিন, কেরামতমঙ্গল, অবরুদ্ধ শহীদ মিনার, চারিদিকে কাকের ডাক, ইংগিত। নির্দেশিত নাটকগুলোর মধ্যে কাকলাস, কোর্টমার্শাল, গোলমালের আযম, জেগে উঠে জলেশ্বরী, অনুরাধা, উট মানুষের দেশে, জলশিকারী উল্লেখযোগ্যভাবে তার মেধা ও দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরে সারা উত্তরবঙ্গে তথা বাংলাদেশে।

নব্বই দশকের শুরুতে চলে আসেন ঢাকায়। নাট্যকার ও নাট্যজন আশীষ খন্দকারের আমন্ত্রণে যুক্ত হন নতুন নাট্য ধারণার সাথে যার নাম পরিবেশ থিয়েটার। দীর্ঘদিন এই ধারণার কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখে নিরলস কাজ করেন। পরিবেশ থিয়েটারের মূল প্লাটফর্ম স্পেস অ্যান্ড অ্যাক্টিং রিসার্চ সেন্টারের জন্মলগ্ন থেকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা যেমন- “মোহাম্মদ আমিন”, মৃত্তিকার কম্পাস, বেগম, একটি শিরোনামহীন নাটক এবং মলিয়ের কমেডি “বউদের পাঠশালা’ তে তার অভিনয় ঢাকার নাট্যাঙ্গন ও বোদ্ধা মহলে প্রশংসা কুড়ায়। “বউদের পাঠশালা’ ঢাকা উৎসব’ ২০০৪ এ মঞ্চায়নের পর দৈনিক প্রথম আলো ক্রোড়পত্র বের করে। ডেইলি স্টার বক্স প্রতিবেদনে মোহাম্মদ আমিন এর আর্নলফি চরিত্রে অভিনয় দক্ষতার ভূয়সি প্রশংসা করেন। কিছুদিন ঢাকা থিয়েটার মঞ্চে মলিয়ের এর “ঘর জামাই” চরিত্রে অভিনয় করেও দর্শক ও নাট্য বোদ্ধাদের নজর কারেন।

১৯৯৭ সালে মুক্তমঞ্চ থিয়েটার, ঢাকা তার রচনা ও নির্দেশনায় মঞ্চে আনে সমসাময়িক লোকজ ধ্রুপদী ‘অনুরাধা’ যা তাকে নাট্যকার ও নির্দেশক হিসাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।

১৯৯৫ সালে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ মেধাবী নাট্যকর্মী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে দ্য নিউ থিয়েটার হাউজ এর আমন্ত্রণে “রিসোর্সেস রিসার্চ পারফরমেটিভ আর্টস” এর ওপর একটি আইডিয়া এক্সচেঞ্জ কোর্স এ বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ ও সম্পন্ন করেন। এই কোর্সটি করতে যেয়ে তিনি ভারত উপমহাদেশীয় শিল্পকলার বিভিন্ন উৎস ও আঙ্গিকের সাথে পরিচিত হন। সুযোগ ঘটে ইতালী, ফ্রাঞ্চ, স্পেন ও ভারতসহ আন্তর্জাতিক থিয়েটার অঙ্গনের অনেক পেশাদার নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক, ডিজাইনার ও ভারতীয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক শিল্পকলার পন্ডিত ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হবার এবং একসাথে কাজ করার।

নিজের শিল্প ভাবনাগুলোকে নিজের মতো করে তুলে ধরতে ২০০০ সালে ‘ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার অ্যান্ড এডুকেশন’ নামে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন। এখন যা ‘ইনস্টিটিউট অব কালচার অ্যান্ড এডুকেশন’-আইস্ নামে পরিচিত। এটি সবার জন্য মুক্ত একটি প্লাটফরম। নিজ জেলা গাইবান্ধায় এটি নতুন নাট্যকর্মীদের জন্য একটি আদর্শ স্থান।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আমন্ত্রণে প্রকল্পভিত্তিক তিনটি মঞ্চ নাটক ‘বুনো ষাঁড়ের গল্প’ (২০১৩), খাঁচা (২০১৪) এবং ধন্য রাজার পূণ্যদেশে (২০১৫) নির্মাণ ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে আবারও অভিনেতা ও নির্দেশক হিসেবে ঢাকার দর্শক ও বোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করেন।

প্রচারবিমুখ এই প্রতিভাবান অভিনেতা ও নাট্যকার মিডিয়ায় প্রবেশ করে অভিনেতা ও শিল্প নির্দেশক হিসেবে উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প নির্দেশক ও গীতিকার হিসেবে এনটিভি প্রচারিত ‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’ (ধারাবাহিক) এবং আরটিভি প্রচারিত ‘রাজা ভাওয়াল সন্যাসী’ (ধারাবাহিক)। অভিনেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে আব্দুল্লাহ রানা পরিচালিত এনটিভি প্রচারিত ‘চৌকিদার’ (টেলিফিল্ম), দেশ টিভি প্রচারিত ‘ছায়া মুখোস’ (ধারাবাহিক), ‘পাতাল পুরীর গল্প’ (৭ পর্বের ধারাবাহিক, পান্ডুলিপি- বৃন্দাবন দাস), অর্ক মোস্তফা পরিচালিত ৭ পর্বের ধারাবাহিক ‘এখানে প্রবেশ নিষেধ’ (দেশ টিভি), জাহিদ মাহমুদ পরিচালিত ‘ফুটবল’ (দেশ টিভি) সহ বেশ কিছু কাজ।
আশীষ খন্দকার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বাথান’ এ শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেন। অভিনয় করেছেন বিকল্প ধারার কয়েকটি চলচ্চিত্রে। তার মধ্যে আশীষ খন্দকারের ‘তার কোনো নাম নেই’ ও সারোয়ার জাহান খানের অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অপেক্ষা’ উল্লেখযোগ্য।

প্রতিভাবান এই অভিনেতার মঞ্চের প্রতি রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। কাজ করতে পছন্দ করেন নতুনদের সাথে। বিশেষভাবে মফঃস্বল শহরের কাদামাটির মতো নতুন নাট্যকর্মীদের সাথে। ওদেরকে ইচ্ছে মতো তৈরি করা যায়। আর নিজেকে প্রতি মুহূর্তে ঝালাই করে নেয়ার সুযোগ পান বলেই চলে যান ওদের সাথে কাজ করতে। তবে মোহাম্মদ আমিন মনে করেন ভাল থিয়েটার ও অভিনয়ের জন্য প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রচুর পড়াশুনা, চর্চা ও পর্যবেক্ষণ আর সব সময় মেধা, মনন ও চিন্তায় সক্রিয় থাকা।

মিডিয়ায় নিয়মিত হওয়া প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, “অভিনয়ের জন্য ভাল গল্প, গল্পে চরিত্রের গুরুত্ব এবং নির্মাণের প্রতি যত্নশীল মেধাবী নির্দেশকের অপেক্ষায় থাকি সব সময়। আর নির্মাণের সুযোগ খুঁজছি দীর্ঘদিন থেকে।” এমন সুযোগ পেলে নিয়মিত কাজ করতে চান মিডিয়া ও চলচ্চিত্র মাধ্যমে।

লেখক: নাট্যকর্মী

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য