artk
৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ৮:৩২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

রাজনীতি নয়, চাই আনুগত্য

পলাশ পাল |
প্রকাশ: ১০৫৯ ঘণ্টা, শনিবার ১৭ মার্চ ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২০৩৮ ঘণ্টা, শনিবার ১৭ মার্চ ২০১৮


রাজনীতি নয়, চাই আনুগত্য - অসম্পাদিত
ছবি প্রতীকী

সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাবত বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে লোক ঢোকাচ্ছে পাকিস্তান। চীনের মদদে ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে অস্থির করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থান শীর্ষ কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে নাখোশ দেশটির বোদ্ধা মহল। তারা একে অপ্রত্যাশিত ও এখতিয়ার বর্হিভূত ও গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক বলে মনে করেন। অথচ বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খা বাহিনীর কর্মকর্তারা হরহামেশাই রাজনৈতিক দল ও বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এতে দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মুখ থেকে একটি কথাও বের হয় না।

ভারতীয় সেনাপ্রধানের অযাচিত বক্ত্যব্য নিয়ে শনিবার দেশটির প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। নিউজবাংলাদেশের পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

প্রথম ভারতীয় কম্যান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল কে এম কারিয়াপ্পাকে সাবধান করে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, “নট টু প্লে দ্য রোল অব সেমি-পলিটিক্যাল লিডার।” সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক পরিকল্পনায় নাক গলাচ্ছিলেন তিনি। এক জন পেশাদার সৈনিকের রাজনৈতিক বিষয়ে এহেন কৌতূহলকে স্বাভাবিকভাবেই বরদাস্ত করতে পারেননি নেহরু। ১৯৫৩ সালে বিদায়ী ভাষণে সতীর্থদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, “রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ নয়, নির্বাচিত সরকারের প্রতি আনুগত্যই সেনাবাহিনীর একমাত্র কর্তব্য।”

সম্প্রতি সেনাপ্রধান বিপিন রাবত বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে লোক ঢোকাচ্ছে পাকিস্তান। চীনের মদদে ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে অস্থির করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে। অসমে বদরুদ্দিন আজমের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট-এর দ্রুত প্রভাব বাড়ার পেছনেও রয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া হয় বিপিন রাবতের উদ্দেশ্য শুভ, তিনি ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যটির নিরাপত্তা নিয়ে যারপরনাই চিন্তিত, তবু এক জন সর্বোচ্চ পদের সেনা কর্মকর্তা প্রকাশ্য সভায় রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন এবং সরকারও তাতে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে বিষয়টিকে এক রকম মান্যতা দিয়েছে, বিস্মিত হতে হয় বইকি। এটা শুধুমাত্র অপ্রত্যাশিত ও এখতিয়ার-বর্হিভূতই নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনকও বটে।

দুর্ভাগ্য, জেনারেল রাবত এমন এক সময়ে এই অভিযোগ করেছেন, যখন অসমে নাগরিক নিবন্ধকরণের কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ের খসড়া তালিকায় এক কোটি ৯০ লাখ লোককে নাগরিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও তালিকার বাইরে রয়ে গিয়েছেন আরও এবং কোটি ৩০ লাখ মানুষ। এঁদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী বা তাদের বংশধর বলে অভিযোগ। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রহীন অনাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির সরকার ইতিমধ্যেই পার্লামেন্টে একটি আইন পাস করেছে, লক্ষ্য, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। রাবতের বক্তব্য সেই আগুনে ঘি নিক্ষেপের সামিল। ১৯৮০-র দশকে আসাম জুড়ে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনের পরিণতি তার ভুলে যাওয়ার কথা নয়।

রাজনীতিতে কোনো দল দ্রুতগতিতে বাড়ার নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এই উত্থানপতনের পেছনে রয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশ, এমন ধারণায় অতি সরলীকরণের সঙ্গে পক্ষপাতও আছে। আসামের গত তিনটি বিধানসভার নির্বাচনে কংগ্রেস, বিজেপি, এআইইউডিএফ বা আসাম গণপরিষদ, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আসন ও প্রাপ্ত ভোটের হার ওঠানামা করেছে। এক সময়ের প্রভাবশালী দল আসাম গণপরিষদের জনপ্রিয়তা কমে এখন মাত্র ৮ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপি ও এআইইউডিপির জনসমর্থন সমানেই বেড়েছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে এই দুটি দলের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৯ ও ৯ শতাংশ। ২০১৬তে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ ও ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান-পতনের নেপথ্যে অভিবাসনের থেকে নিজ নিজ দলের কার্যক্রমের ভূমিকাই বেশি।

জেনারেল রাবতের বিতর্কিত মন্তব্য এটাই প্রথম নয়। এর আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে তিনি শিরোনামে এসেছেন। গত জানুয়ারিতে জম্মু ও কাশ্মীরের শিক্ষানীতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, ওই রাজ্যের সরকারি স্কুলের পাঠ্যক্রম বিপজ্জনক। বলেছিলেন, মানচিত্র দুটি। একটি ‘জম্মু ও কাশ্মীর’-এর, অন্যটি ‘ভারতের’। ২০১৭ সালে কাশ্মীরের সব আন্দোলনকারীকে সন্ত্রাসবাদী বলে বিতর্ক ছড়িয়েছিলেন। নাগরিক আন্দোলন ও জঙ্গিদের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখার ফলটা ভালো হয়নি।

পৃথিবীর কোনো দেশের সেনাবাহিনীই পুরোপুরি নীরব নয়। রাজনীতির বাইরের জগতের মানুষ হলেও তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত থাকে। তবে একটু সংযত হয়ে চলতে হয়। বিপিন রাবত কিন্তু সেনাপ্রধান হয়েও যেন রাজনৈতিক বিবৃতি দিচ্ছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যা নিতান্তই বেমানান। এই বিবৃতির পালা যদি লাগামহীনভাবে চলতেই থাকে এবং সরকারের ভূমিকাটা হয় নীরব দর্শকের, তাতে বিপদের আশঙ্কা প্রচুর, সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেয়।

আমাদের জাতীয় জীবনে সেনা-জওয়ানদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ নিয়ে এক ধরনের সম্ভ্রম রয়েছে। তারা প্রতিকূল পরিবেশে জীবন বাজি রেখে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করেন, আর এই কারণেই তাদের কথাবার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গুরুত্ব জনসাধারণের কাছে অনেক বেশি। রাজনীতিকরাও এর সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ ও গুজরাটের নির্বাচনে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ছিল রাজনৈতিক প্রচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইতিহাস বার বার প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক ভাষ্যে এক বার সামরিকীকরণ ঘটলে তাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সেনা জেনারেলদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের ক্ষুধা জেগে উঠলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও অত্যন্ত দুরূহ। পাকিস্তান ও মিয়ানমার উদাহরণ। রাবতকে ঠিকমত শাসন করা সরকারের অবশ্যকর্তব্য।

[দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশের ভাষাভঙ্গি ও নিউজবাংলাদেশের নিজস্ব ভাষা রীতির আলোকে কিছু বানান ও শব্দ পরিবর্তন করা হয়েছে।]

নিউজবাংলাদেশ.কম/এফএ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য