artk
৭ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার ২০ এপ্রিল ২০১৮, ৬:৪১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ছোটগল্প
অভিমান

| নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ০৯৪০ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ০৮ মার্চ ২০১৮


অভিমান - শিল্প-সাহিত্য

মোহনা সকাল থেকে ফুরফুরে মেজাজে আছে। মাঝে মাঝেই তার এমন হয়। ঘুম থেকে উঠেই মনটা কোন কারণ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। চারপাশের সবকিছুকে খুব সুন্দর আর অর্থবহ মনে হয়। এই যেমন এখন পাশের বাসা থেকে ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। এটা খুবই স্বাভাবিক কিন্তু তার ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। আবার স্বাভাবিক ঘটনাও তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেদিন তার এক বান্ধবীর কি কারণে যেন হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার জোগাড় হল। খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু তখন কেন যেন মনে হচ্ছিল ওকে যদি কষে একটা চড় লাগানো যেত।

পড়াশুনার পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ায় তেমন কোন কাজও নেই। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে উঠানে গিয়ে দাঁড়ালো। মফঃস্বল শহরে ওরা বেশ অবস্থাপন্ন। বড় ভাই পড়াশুনা শেষে একটা এনজিওতে চাকরি নিয়ে বিয়ে করে স্ব-পরিবারে ঢাকায় চলে গেছে। তার চেয়ে তিন বছরের বড়বোন সোহানার দুই গ্রাম পরে বিয়ে হয়ে গেছে। বাসায় একা একা মাঝে মাঝে খুব একঘেঁয়ে লাগে। গতকাল তার মা বলছিল কয়েকদিনের জন্য সোহানার শ্বশুরবাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসতে।

বিকেলে সে সোহানাদের বাসায় পৌঁছলে ওদের বাসার সবাই রীতিমতো অবাক আর খুশি হয়। কারণ গত দুই বছরে অনেকবার অনুরোধ করেও তাকে সোহানাদের বাড়িতে আনতে পারেনি। আর সোহানার জামাই ব্যবসার কাজে ঢাকায় থাকায় মোহনাকে কাছে পেয়ে দু’বোনের আড্ডা আরও জমে ওঠে। কয়েকদিন পরে সোহানাদের গ্রামে চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা বসে। সেখানে যাত্রাপালাও শুরু হয়।

এক রাতে সোহানার শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে ওরা দু’বোন যাত্রা দেখতে গেলো। যাত্রা বেশ জমে উঠেছে। পালার মধ্যমণির অভিনয় নৈপুণ্য সবাইকে কিছুক্ষণের জন্য মুগ্ধ করে রাখল। যাত্রা শেষ হওয়ার পর ওরা দুবোনে যখন প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে আসছে তখনই গ্রিনরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আজকের যাত্রার মধ্যমণিকে দেখে মোহনার ভিমরি খাওয়ার মতো হল। ছেলেটির চোখে তার চোখ পড়তেই এক মুহূর্ত তাকিয়েই আবার চোখ নামিয়ে নিল।

বাসায় এসে সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো। বালিশে মাথা রাখতেই তার স্মৃতিতে ভেসে উঠলো দু’বছর আগের কথা। সে তখন রোকেয়া হলে থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। টিএসসিতে বসে বিকেলে বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেয়। এমনি এক বিকেলে ডিপার্টমেন্টের ছেলেরা এসে হাজির।

একজন বলল, মোহনা এবারের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে আমরা একটা নাটক মঞ্চস্থ করবো। তোমাকেও কিন্তু আমাদের সাথে অভিনয় করতে হবে। সে আকাশ থেকে পড়লো আর অবাক চোখে বলল

এক্সকিউজ মি। আমাকে দিয়ে অভিনয় হবে টবে না। আর তাছাড়া আমি জীবনে কোনদিন স্টেজে বক্তৃতাই করিনি। এবার পাশ থেকে একটি সুদীপ্ত চেহারার একজন অত্যন্ত কনফিডেন্সের সুরে বলল, আমরা সবাই মিলে রিহার্সেল করবো। আর আপনার কোন না শুনতে আমরা আসিনি। অন্য সবাই ছেলেটার সুরে সুর মেলালো।

অবশেষে মোহনা রাজী হয়ে গেলো। রিহার্সেলে মাসুদের সাথে কাজ করে খুব ভালো লাগলো তার। অভিনয়ে তার জুড়ি মেলা ভার। অভিনয়ের পাশাপাশি সে নাটক পরিচালনার কাজটিও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করলো।

নবীন বরণ অনুষ্ঠানে নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর তারা দুজন একটি জুটিতে পরিণত হল। সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো তাদের দুজনের অভিনয় নৈপুণ্যের কথা। তখন সবেমাত্র প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলি আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। ঠিক এমনি এক বিকেলে টিএসসির সামনে কয়েক বান্ধবী মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক সালাম দিয়ে তাদের পাশে এসে মোহনাকে বলল

আমি টিভি চ্যানেলের একজন প্রযোজক। আমরা আপনাকে একটা নাটকের জন্য কাস্ট করতে চাই। মোহনা বিস্ময়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতেই সে শুনলো, মিস মোহনা, আপনার মৌনতা দেখে আমি ধরে নিচ্ছি আপনি আমাদের সাথে কাজ করবেন।

তারপর একটা ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে প্রযোজক সাহেব চলে গেলেন। পরদিন তার নাটকে অফার পাওয়ার খবরটা সারা ডিপার্টমেন্টে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে গেল। কিছুদিন পরে তার অভিনীত বিশ মিনিটের একটি নাটক টিভিতে প্রচারিত হল। ডিপার্টমেন্টের সব ছেলেমেয়েরা তাকে অভিনন্দন জানাতে এলেও মাসুদকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও হলে কিংবা ডিপার্টমেন্টের কোথাও পাওয়া গেলো না।

ব্যাপারটা দিনে দিনে মোহনাকে বেশ ভাবিয়ে তুলল। মাসুদকে না জানিয়ে টিভিতে অভিনয় করতে যাওয়ায় এক ধরনের অপরাধবোধ আর হীনমন্যতা তাকে পেয়ে বসলো। তারপর সে আরও অনেক নাটকের অফার পেলেও পড়াশুনা পরীক্ষা ইত্যাদি অজুহাতে নিজেকে সরিয়ে রাখল।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতে তার বেশ বেলা হয়ে গেল। কোনমতে চোখে মুখে পানির ছিটা দিয়ে ভর দুপুরে মোহনা যাত্রাদলের প্যান্ডেলে গিয়ে হাজির হয়। ম্যানেজারের সাথে দেখা করে জানতে পারে আজ ভোরবেলা মাসুদ অজ্ঞাত কারণে ঢাকা চলে গেছে। তার কোন ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর জানতে চাইলে ম্যানেজার অপারগতা প্রকাশ করে। মোহনা প্যান্ডেলের এক কোনে জড়সড় হয়ে বসে পড়ে। হঠাৎ মাসুদের ডিপার্টমেণ্ট থেকে নিরুদ্দেশ হওয়ার বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সাথে সাথে ছেলেটার জন্য তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে হু হু করে ওঠে। অবচেতন মন কি তাহলে এই অতি অভিমানী ছেলেটার জন্য মনের গহীনে অনেক আগে থেকেই ভালবাসার ডালি সাজিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছে?

লেখক: নাইম আবদুল্লাহ, সিডনি প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য