artk
৬ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার ২০ এপ্রিল ২০১৮, ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

মাদারীপুরে স্পিনিং মিল বন্ধ, মানবেতর দিন কাটাচ্ছে হাজারো শ্রমিক

মো. জাকির হোসেন, মাদারীপুর | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৭২৬ ঘণ্টা, রোববার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৮৩২ ঘণ্টা, সোমবার ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮


মাদারীপুরে স্পিনিং মিল বন্ধ, মানবেতর দিন কাটাচ্ছে হাজারো শ্রমিক - বিশেষ সংবাদ

মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর এলাকায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে ৩৩ একর জমির ওপর জেলার একমাত্র মাদারীপুর স্পিনিং মিলের অবস্থান। ১৯৭৮ সালে সরকারিভাবে মিলটি প্রতিষ্ঠিত হলেও আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু করে ১৯৮১ সালে। সরকার ১৩ বছর মিলটি চালানোর পর ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে কিশোরগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে মিলটি বিক্রি করে দেয়। মিলটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ার পর থেকে ভালোই চলছিল। মিলে মাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ বেল সুতা উৎপাদন হতো। তিন সিফটে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কাজ করতো।

কিন্তু মিলের মালিক সরকারের বকেয়া পরিশোধ এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার কারণে ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই সম্পূর্ণ চালু অবস্থায় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিলটি সিলগালার করে দেয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয় “মাদারীপুর স্পিনিং মিল মস্তফাপুর, মাদারীপুর। রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের আর্থিক সহায়তা পুষ্ট একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমি, স্থাপনা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামালসহ সমুদয় সম্পত্তি রূপালী ব্যাংক লিমিটেড স্থানীয় কার্যালয়, ঢাকার নিকট দায়বদ্ধ।”

প্রায় ৬ মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত মিলটি চালু না হওয়ায় মিলের প্রায় ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক-কর্মচারী অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। মিলের সিংহভাগ শ্রমিক ছিল স্থানীয় গরীব ও অসহায় নারী। যাদের সংসারের সম্পূর্ণ ব্যয় নির্ভর করতো তাদের বেতনের ওপর। এখন মিল বন্ধ থাকায় এবং আয়ের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায পরিবার পরিজন নিয়ে শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। শ্রমিকদের দাবি, সরকার বা মালিক যেই মিল চালাক না কেন সেটা তাদের দেখার বিষয় না। তারা চায় মিল দ্রুত চালু হোক এবং তারা পূর্বের ন্যয় কাজ করতে পারে। এখন বিটিএমসির একজন ম্যানেজার ইনচার্জ ও আনসার সদস্যসহ মোট ১৩ জন লোক মিলের ভিতরে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।

মিলের এক নারী শ্রমিক মাজেদা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের অনেকের স্বামী নাই। এখানকার বেতন দিয়ে সংসার চলতো। বহু অসহায় মেয়ে আছে, তারা এই মিলে কাজ করতো। এখন খুবই দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। আমরা জানি, এই সরকার শ্রমিকবান্ধব সরকার। তাই সরকারের কাছে দাবি যেন দ্রুত মিল চালু করে দেয়।”

মিলের আরেক শ্রমিক মাহিনুর বলেন, “প্রায় ৬ মাস ধরে মিলটি বন্ধ হয়ে আছে। আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে মাঝে মধ্যে অনাহারে দিন কাটাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, তিনি যেন মিলটি তাড়াতাড়ি খুলে দেন।”

নাম না প্রকাশ করার শর্তে মিলের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে অন্যতম একটি মিল হচ্ছে এটি। ব্যক্তি মালিকানায় আসার পর থেকে ভালোই চলছিল মিলটি। জেলার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ মিলে, বিশেষ করে মস্তফাপুর এলাকার গরীব, অসহায় মহিলারা মিলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো।”

বিটিএমসির উপ-মহাব্যবস্থাপক কাজী ফিরোজ হোসেন বলেন, “মিলটি বন্ধের প্রধান ইস্যু শুধু টাকা নয়, এর সাথে আরো অন্যান্য বিষয় জড়িত আছে। সরকারের সাথে মালিকের যে চুক্তি ছিল তা মালিক পক্ষ রাখেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার মালিক পক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য। কিন্তু মালিক পক্ষ একবারের জন্যও আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি এবং চিঠির কোন উত্তরও দেয়নি। তাছাড়াও মালিক ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছে তাও সঠিকভাবে ব্যবহার করেনি। ব্যাংকের ঋণও পরিশোধ করে নাই। সব কিছু মিলে আমরা মিলটি বন্ধ করে দেই এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। পরবর্তীতে আমরা মিলটি বিটিএমসির মাধ্যমে চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলাম। এ সময় মালিক পক্ষ হাই কোর্টে একটি রিট করে, এ জন্যই মিলটি চালু করতে বিলম্ব হচ্ছে। হাই কোর্ট থেকে রিটের নিষ্পত্তি হলে এবং যদি রায় আমাদের পক্ষে আসে তা হলে আমরা যত দ্রুত মিলটি চালু করে দিবো। কারণ মিলের সাথে বহু লোকের কর্মসংস্থান জড়িত।”

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, “বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক আমরা মাদারীপুর স্পিনিং মিলটি মালিকের কাছ থেকে সরকারের দখলে এনে দেই। মালিক যিনি মিলটি চালানোর জন্য সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সরকারের পাওনা টাকা পরিশোধ করেন নাই। টাকা পরিশোধের জন্য তার সাথে বার বার যোগাযোগ করা হয়েছে, পত্র দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি তাতে কোনো সাড়া দেননি। সর্বশেষ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মিলটি সরকারের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি এই সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর আমরা চলমান মিলটি বন্ধ করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি এবং পরবর্তীতে বিটিএমসিকে মিলটির দায়িত্ব বুঝিয়ে দেই। সরকার মিল মালিকের কাছে পাবে আমার জানা মতে, মাত্র ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার মত। আর রূপালী ব্যাংক থেকে মালিক ঋণ নিয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মত। এত টাকা ঋণ নিয়ে সরকারের সামান্য টাকা পরিশোধ করতে পারলো না। এতে বোঝা যায় মালিকের অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে। সেটা এখন খতিয়ে দেখতে হবে। দীর্ঘ ৬ মাস যাবত মিলটি বন্ধ আছে। মিলের শ্রমিকরা তাদের বকেয়া টাকা পাওয়ার জন্য আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় এসেছে। আমরা কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকদের দুঃখ-দর্দশার কথা বলেছি। কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/জেডএইচ/এসডি/এএইচকে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত