artk
৭ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রোববার ২১ জানুয়ারি ২০১৮, ৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

অরুণিমা প্রবচনগুচ্ছ এবং একজন হুমায়ুন আজাদ

সালাম সালেহ উদদীন |
প্রকাশ: ১২১৯ ঘণ্টা, শুক্রবার ১২ জানুয়ারি ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৮২৫ ঘণ্টা, শুক্রবার ১২ জানুয়ারি ২০১৮


অরুণিমা প্রবচনগুচ্ছ এবং একজন হুমায়ুন আজাদ - শিল্প-সাহিত্য

হুমায়ুন আজাদ আমার শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মাস্টার্সে আধুনিক সাহিত্য পড়াতেন। তিরিশের পাঁচ কবি (জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত) ও সমর সেনসহ অন্য আধুনিক কবিদের কবিতাও তিনি পড়াতেন। ছাত্র-শিক্ষকের মধুর সম্পর্ক হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আমার ছিল না। তবে বাংলা বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মানে ভর্তি হয়েই আমি তার মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হই। এই মনোযোগ আকর্ষণের কারণ কেবল মেধাবী ছাত্র হিসেবে নয়, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক থাকার কারণে।

আমার নিজস্ব উদ্যোগে সহপাঠীদের নিয়ে বাংলা বিভাগ থেকে অরুণিমা নামে একটি দেয়াল পত্রিকা কয়েক সংখ্যা বের করি। এরপর বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে অরুণিমা মুদ্রিত অক্ষরে লিটল ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন কবি-বন্ধু শামসুল আরেফিন। সম্ভবত বাংলা বিভাগ থেকে কম্পিউটার কম্পোজে অরুণিমাই প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা।

আশির দশকের শেষের দিকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছিল। যদিও ওই সময় সাহিত্য পত্রিকা লোকায়ত, একবিংশ, সাহিত্য সাময়িকী, সাহিত্যপত্র, অনিন্দ্য, রূপম, সুন্দরম, অর্চি, প্রেস, বিসুভিয়াস, কিছুধ্বনি বের হতো। লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে গাণ্ডিব বেরিয়েছে, তারও কিছু আগে। ঢাকার বাইরে থেকে বের হতো নান্দীপাঠ, বিপ্রতীপ, লিরিক, চালচিত্র, নিসর্গসহ বেশকটি লিটল ম্যাগাজিন। রাজধানীর বাইরে এই আন্দোলন তখনও ভাটা পড়েনি। তখন আরও কিছু পত্রিকা বের হতো যার নাম আমি এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।

অরুণিমার প্রথম সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদের ধর্ম ও বন্দুক নিবন্ধটি ছেপেছিলাম। পত্রিকাটির প্রশংসা করেছিলেন তিনি। অবশ্য তিনি এতোটাই কাঠখোট্টা স্বভাবের ছিলেন যে নিজের প্রশংসাই করতেন বেশি। তার মুখে অরুণিমার প্রশংসা শুনে আমরা দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার প্রস্তুতি নিতে থাকি। স্বাভাবিক নিয়মেই হুমায়ুন আজাদের কাছে লেখা চাই। বারবার তাগিদ দেওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের লেখার কথা বলেন। যা শুনে আমিও কিছুটা বিস্মিত হই। তবে তাকে অনুপ্রাণিত করি এবং বলি ওই লেখা প্রকাশ করতে সম্পাদক হিসেবে আমার কোনো আপত্তি নেই। অবশেষে ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ নামে ২৫টি প্রবচন তিনি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। এর আগে খনার বচনের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি। গ্রামীণ প্রবাদ-প্রবচনের বেশকটি আমি আমার দাদীর কাছ থেকে শুনেছি। খনার বচন ছাড়া দাদীর মুখে শোনা প্রবচন রচয়িতাদের নাম আমি জানি না। যেমন- খাটলে মায়না জঙ্গলে, নি নাইয়ার শতেক নাও, আগের হাল যেদিক যায় পেছনের হালও সেদিক যায়, ও আমার ময়নামাসীর ঝি, পেটের ছেলে রাজা হল- আমি হলাম কী, মজা মারে ফজা ভাই আমরা কয় ভাই বৈঠা বাই ইত্যাদি।

আশির দশকের শুরুতে ইংরেজ লেখক, চিন্তাবিদ অনেকেই নাকি এমন প্রবচন লিখেছেন- এ কথা হুমায়ুন আজাদ আমাকে বললেন। আমি প্রবচন পাঠান্তে বিস্মিত হই। অরুণিমার দ্বিতীয় সংখ্যায় ২৫টি প্রবচন গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। বাংলা বিভাগসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। তখন অবশ্য আজিজ মার্কেটের সাহিত্যপাড়া বা কবিপাড়া ছিল না। থাকলে কী হতো তা বলাই বাহুল্য। হুমায়ুন আজাদের শত্রু-শিক্ষক ও সহকর্মীরা ক্ষেপে ওঠেন। প্রচনকে আজেবাজে রচনা হিসেবে চিহ্নিত করেন। কেউ কেউ ইংরেজি প্রবচনের অনুবাদ বলেও অভিযোগ তুলেন।

এ দেশে সব্যসাচী লেখক বলে খ্যাত সৈয়দ শামসুল হক ওই সময় দৈনিক সংবাদের সাময়িকীর পাতায় ‘হৃৎকলমের টানে’ সাহিত্য কলাম লিখতেন। ওই কলামে তিনি প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে লেখেন। যা ছিল আক্রমণে ঠাসা। যেহেতু সৈয়দ হকের ওই নিয়মিত সাহিত্য কলাম জনপ্রিয় ছিল সেহেতু দেশের সিভিল সমাজ ঘা খেয়ে উঠে। দুয়েকটি প্রবচন এখানে উল্লেখ করছি ‘আগে কানন বালারা আসতো পতিতালয় থেকে, এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’ ‘শামসুর রাহমানকে জনৈকা অভিনেত্রীর সঙ্গে টিভি পর্দায় দেখা গেল, শামসুর রাহমান জানেন না কার সঙ্গে পর্দায় যেতে হয়, আর কার সঙ্গে সয্যায় যেতে হয়’। প্রথম প্রবচনটি নিয়ে দেশব্যাপী হৈ চৈ পড়ে যায়।

হুমায়ুন আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ‘পতিতা’ আখ্যা দিয়েছেন এটা গর্হিত অপরাধ। বিশেষ করে মৌলবাদীরা ফুঁসে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া-শামসুন্নাহার হলের মেয়েরা হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে একাধিক মিছিল বের করে। খুঁজতে থাকে আমাকেও। যেহেতু অরুণিমার সম্পাদক ছিলাম আমি। সংবাদ সাময়িকীতে হুমায়ুন আজাদকে সমর্থন করে পরপর দুটো মতামত প্রকাশিত হয়। এরপর বিচিত্রা, সচিত্র সন্ধানী, রোববার, বিশ্বদর্পণ, তারকালোক, ছায়াছন্দ, মানচিত্র, সুগন্ধা ইত্যাদি পত্রিকায় অরুণিমা ও হুমায়ুন আজাদের বিতর্কিত প্রচন গুচ্ছ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে লেখা বের হয়। এই সুযোগে দৈনিক সংগ্রাম সৈয়দ হক ও হুমায়ুন আজাদকে তীব্র আক্রমণ করে ধারাবাহিকভাবে ছয়দিন উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। দেশব্যাপী তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সাতদিনের মধ্যে অরুণিমার সব সংখ্যা শেষ হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হাতে প্রবচনগুচ্ছের ফটোকপি দেখা যায়।

শামসুর রাহমান তখন দৈনিক সংবাদে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তিনি অবশেষে হাল ধরলেন। তিনি ‘বিতর্কিত প্রবচনগুচ্ছ’ নামে কলাম লিখলেন এবং কারো পক্ষাবলম্বনই করলেন না। ফলে বিতর্ক অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসে। কথাসাহিত্যক হামিদ কায়সার পরবর্তীকালে অরুন্ধতীর প্রথম সংখ্যায় লিখলেন- ‘অরুণিমা নিয়ে সাতকা- ও থলের বিড়াল সমাচার’।

এ প্রসঙ্গে নিশ্চিতভাবেই বলা প্রয়োজন যে, হুমায়ুন আজাদ প্রবচনগুচ্ছ প্রকাশের আগে কেবল একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। বিভাগের ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের লোকজনের মধ্যেই তার খ্যাতি ও পরিচিতি সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও ওই সময়ে অলৌকিক ইস্টিমার, জ্বলো চিতাবাঘ, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, শামসুর রাহমান/ নিঃসঙ্গ শেরপা, বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র, বাক্যতত্ত্ব, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষা বিজ্ঞান, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তিনি জনক। তা সত্ত্বেও প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে হৈ চৈ হওয়ার পরই তিনি জাতীয়ভাবে পরিচিতি অর্জন করেন এবং এর একক কৃতিত্ব অরুণিমারই। পরবর্তীকালে নারী ধারাবাহিকভাবে প্রথমে সাপ্তাহিক খবরের কাগজে এবং আরও পরে বই আকারে প্রকাশিত হলে তার খ্যাতি আরও বেড়ে যায়।

রাতারাতি অরুণিমা একটি জাতীয় পত্রিকা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। অরুণিমা, হুমায়ুন আজাদ, সৈয়দ হকের পাশাপাশি বোদ্ধা মহলে উচ্চারিত হতে থাকে আমার নামও। অল্প কিছুদিনের মধ্যে খ্যাতির বিড়ম্বনা আমাকে পেয়ে বসে। বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের, যারা অরুণিমা প্রকাশের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের ঈর্ষার কারণ হই আমি। তারা মনে করে তরুণ বয়সেই আমি খ্যাতিমান সম্পাদক হয়ে গেছি। অবশেষে আমার সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে উঠলো না। অরুণিমার পরিচালনা বা সম্পাদনা পর্ষদ যাদের দু’একজন বাদে সবাই ছিল সংকীর্ণমনা ও নিম্নরুচিসম্পন্ন। তাদের অসংস্কৃত ও অসাহিত্যসুলভ আচরণের কারণে আমি সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হই। পরবর্তীকালে শিবিরঘেঁষা এক তথাকথিত কবি নাছীর মাহমুদের সম্পাদনায় অরুণিমার আরও একটি সংখ্যা বের হয়- যা ছিল ভুলে ভরা এবং হাতে নেবার সম্পূর্ণ অযোগ্য। এরপর আমারই চোখের সামনে পত্রিকাটির অপমৃত্যু ঘটে।

আমার সঙ্গে অরুণিমার সম্পাদনা পরিষদের দুজন সদস্য বেরিয়ে এসেছিলেন। একজন আর-রাজী-পাপ্পু (খন্দকার আলী আর রাজী) যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, অন্যজন হাকিম আরিফ, তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। অন্যজন কবি চঞ্চল আশরাফ যিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছিলেন। পরবর্তীকালে কামরুল আলম কিরণ আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। পাশাপাশি অন্যান্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও অরুন্ধতীর সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন।

আমরা বাংলা বিভাগের পেশিশক্তিতে দুর্বল তিনজন সহকর্মী নতুন উদ্যোমে একমাসের মধ্যে ঝকঝকে তকতকে অরুন্ধতী নামে একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশ করি। সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন- আর রাজী পাপ্পু, মুনিম খান নোমান, সালমা আক্তার জাহান জলি, জাহানারা কলি, জেসমিন সুফিয়া, ফরিদা ইয়াসমিন নাজু। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নাজিম উদ্দিন। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় কলামের শেষ দু’লাইন ছিল এরকম ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা অকপটে স্বীকার করেও বলতে দ্বিধা নেই, এক পা যখন বাড়িয়ে দিয়েছি, সম্মুখে এগিয়ে যাবোই। সমুদ্রে ঝড় এলে জাহাজ ডোবে- তারপরও কাপ্তান নাবিকেরা প্রস্তুত হয়।’

অরুন্ধতীর প্রথম সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদ আরও ২৫টি প্রবচন লিখেছিলেন। উল্লেখযোগ্য দুটো প্রবচন হচ্ছে ‘দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রেম বলে কিছু নেই। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে তখন প্রতিটিই প্রথম প্রেম’। ‘ফুলের জীবন বড়ই করুণ। অধিকাংশ ফুল নীরবেই ঝরে যায়; আর বাকিগুলো ঝোলে শয়তানদের গলায়।’ এছাড়াও প্রথম সংখ্যার লেখক ছিলেন- আবুল কাসেম ফজলুল হক, সুশান্ত মজমুদার, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, তুষার দাশ, সৈয়দ তারিক, নাসির আহমেদ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, মারুফ রায়হান, নাসরীন জাহান, হামিদ কায়সার, টিপু খন্দকার, চঞ্চল আশরাফ, শামসুল আরেফিন, শাহীন শওকত ও নাহার মনিকা। অরুন্ধতীর পরের এক সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদ আরও ৫০টি প্রবচন লিখেন। যার উল্লেখযোগ্য দুটি হলো- ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত বস্তু : একটি ব্যাধি, অপরটি স্বাস্থ্য এবং ‘কারো প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখার উপায় হচ্ছে- তার সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ না করা’। অরুন্ধতী সব ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে তার ধারাবাহিক প্রকাশনা বজায় রেখেছে এবং এবার ১৮ বর্ষে পা রাখবে।

অরুন্ধতীর সঙ্গে যেসব পত্রিকা যাত্রা শুরু করেছিল তাদের বেশির ভাগেরই অপমৃত্যু ঘটেছে। এই দেড় যুগে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। বরং এখন বলতে গেলে লিটল ম্যাগাজিনের প্রবল জোয়ার দেখা দিয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে বের হচ্ছে প্রচুর নতুন পত্রিকা। বেড়েছে নতুন লেখকের সংখ্যাও। এখনকার তরুণরা বেশ আশাবাদী। পকেটের পয়সা খরচ করে ঢাউশ আকারের ঝকঝকে তকতকে সংখ্যা বের করছে। অরুণিমার প্রকাশনা যেমন বাংলা বিভাগের উগ্র ডানপন্থীদের কারণে টিকিয়ে রাখা যায়নি, ঠিক তেমনি হুমায়ুন আজাদও একই কারণে আমাদের মাঝে আজ নেই। ড. আজাদের মতো স্পষ্টভাষী মানুষের এ সমাজে খুবই প্রয়োজন ছিল, যদিও এই কুৎসিৎ সমাজে, ভাঁওতা ও প্রতারণাপূর্ণ সমাজে, চাটুকার ও দালাল বেষ্টিত সমাজে তার কোন বন্ধু ছিল না। সম্ভবত একই কারণে আমিও তার খুব একটা ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। হুমায়ুন আজাদ সহজে কারো প্রশংসা বা ঋণ স্বীকার করতেন না। তবুও তিনি প্রবচনগুচ্ছের বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন- ‘সালাম আমার ছাত্র। মূলত তারই অনুপ্রেরণায় আমি প্রবচনগুচ্ছ লিখি। যা প্রকাশের পর প্রথাগত সমাজ ঘা খেয়ে ওঠে।’

নব্বইর দশকের শুরুতে হুমায়ুন আজাদ উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ এবং ‘সুভব্রত এবং তার সম্পর্কিত সুসমাচার আমরাই’ (আজকের কাগজ) প্রকাশ করি। তবে দ্বিতীয় উপন্যাসটি ৯ কিস্তি প্রকাশ করার পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার আশঙ্কায় ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দিই। ঘোষণায় আমার নাম থাকলেও এটা কাগজ কর্তৃপক্ষেরই সিদ্ধান্ত ছিল। তা সত্ত্বেও ড. আজাদ আমার ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অনবতি ঘটে। এটা চলে প্রায় ৮ বছর, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। বাংলা একাডেমীর বইমেলায় উগ্র মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি যখন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেন তখন একদিন আমি স্বপ্রণোদিত হয়ে তাকে ফোন করি। তিনি বিস্মিত কিংবা অতি উৎসাহী না হয়ে আমার সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলেন। আজকের কাগজ এবং সাপ্তাহিক খবরের কাগজে তার হামলা-পরবর্তী যত লেখা বের হয়েছে তা আমাকে সংগ্রহ করে দিতে বলেন। আমি খাটাখাটনি করে সব লেখা সংগ্রহ করে তার বাসায় পাঠাই। কিন্তু তিনি আমাকে একটি ফোনও করেননি। আমি বুঝে নিই এটি তার স্বভাবগত দিক। কথা ছিল, একবার তার বাসায় যাবো। কিন্তু প্যাকেটের প্রাপ্তি স্বীকার না করাতে ওই আগ্রহ আমি হারিয়ে ফেলি। এরপর একদিন হঠাৎ তার মৃত্যু সংবাদ শুনতে পাই (১২ আগস্ট, ২০০৪, জার্মানি)।

হুমায়ুন আজাদের মধ্যে সৌজন্যবোধের যথেষ্ট অভাব থাকলেও ঔচিত্যবোধ তার মধ্যে প্রখর ছিল। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি দ্বিধা করতেন না। তাই সহজেই মানুষের বিরাগভাজন হতেন। বাংলা সাহিত্যে এই ঘরানার একজন লেখক পেতে আমাদের বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এফএ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত