artk
৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, বুধবার ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

স্বামী বিবেকানন্দের বাংলা গদ্যের কথা ভুলেই গেল বাঙালি?

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১৫৮ ঘণ্টা, শুক্রবার ১২ জানুয়ারি ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৭১২ ঘণ্টা, শুক্রবার ১২ জানুয়ারি ২০১৮


স্বামী বিবেকানন্দের বাংলা গদ্যের কথা ভুলেই গেল বাঙালি? - শিল্প-সাহিত্য

স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতিন্দ্রীয়য়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। অনেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন। ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, “আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...,” ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা, যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।

“বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” – বিবেকানন্দের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি উক্তি।

১২ জানুয়ারি এই মণীষীর ১৫৬তম জন্মদিবস। তার স্মরণে লিখেছেন আশিস পাঠক। আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে লেখাটি নিউজবাংলাদেশের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

সোজা কথা সোজা করে বলতে বাঙালি এখন প্রায় ভুলেই গিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের সময়ের তুলনায় আমাদের এই চলতি সময়ে কথা লেখার ক্ষেত্র আর স্বাধীনতা দুটোই অনেক অনেক বেশি। কিন্তু বাংলা গদ্যের শিরদাঁড়া এই বিপুল মুক্ত ক্ষেত্রেও বুক বেঁধে দাঁড়াতে পারল না। দু’-একটি ব্যতিক্রম ছেড়ে দিলে বাঙালির গদ্য এখনও অস্পষ্ট, দুমুখো।

তার কারণ কি এটাই যে ভাবনার যুক্তিক্রম, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্ট্রাকচার্ড থিংকিং’ সে বিষয়ে বাংলা প্রবন্ধ-নিবন্ধের অধিকাংশ গদ্যলেখক এখনও শিক্ষানবিশ? হতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে বড় কারণ বোধহয় বাঙালি চিন্তায় সততা ও স্বচ্ছতা ক্রমেই কমে আসছে, বাড়ছে পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার প্রবণতা। অথচ সময়টা একদিন এ রকম ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনের আগে তাঁর বাংলা লেখাগুলি আর এক বার পড়তে গিয়ে মনে হল তাঁর আরও অনেক দিকের মতোই এ দিকটাও পূজার ছলে ভুলেই থেকেছে বাঙালি।

বাগবাজারের বলরাম বসুকে ইলাহাবাদ থেকে ৫ জানুয়ারি, ১৮৯০ নরেন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘...ইতিপূর্বে আপনাকে এক পত্র লিখি– তাহা কি আপনি পাইয়াছেন, না bearing (বিনা মাশুলে প্রেরিত) দেখিয়া...take it করিয়াছেন? আমি বলি change (বায়ু পরিবর্তন) করিতে হয় তো শুভস্য শীঘ্রম। রাগ করিবেন না- আপনার একটি স্বভাব এই যে, ক্রমাগত ‘বামুনের গরু’ খুঁজিতে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ জগতে সকল সময় তাহা পাওয়া যায় না।’

কিংবা সংস্কৃত সাহিত্যের 'গীতগোবিন্দ' প্রসঙ্গে শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীকে বলেছিলেন, ‘‘জয়দেবই সংস্কৃত ভাষার শেষ কবি। তবে জয়দেব ভাবাপেক্ষা অনেকস্থলে jingling of words (শ্রুতিমধুর বাক্যবিন্যাস)-এর দিকে বেশী নজর রেখেছেন। দ্যাখ দেখি গীতগোবিন্দের ‘পতিত পতত্রে’ ইত্যাদি শ্লোকে অনুরাগ ব্যাকুলতার কি culmination (পরাকাষ্ঠা) দেখিয়েছেন? আত্মদর্শনের জন্য ঐ রূপ অনুরাগ চাই, প্রাণের ভিতরটা ছটফট করা চাই।’’

সরাসরি প্রকাশের উন্মুখতা থেকে জেগে ওঠা এই সৎ গদ্য বাংলায় এখন বিরল। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বিবেকানন্দের প্রায় সব মন্তব্য আছে তাঁর শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর ‘স্বামী শিষ্য সংবাদ’-এ। আর তার সঙ্গে পত্রাবলী ও গদ্যগ্রন্থগুলিতে (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, বর্তমান ভারত ইত্যাদি) গদ্যকার বিবেকানন্দকে চেনা যায়।

স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম মৌলিক বই কিন্তু প্রকাশিত হয়েছিল সাধু রীতির গদ্যে, ‘বর্তমান ভারত’। এর পরেই প্রকাশিত হল ‘পরিব্রাজক’, চলিত গদ্যে। ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ গদ্যমালা প্রকাশিত হয়েছিল উদ্বোধন পত্রিকায়। তাঁর সময়ে মুখের ভাষাকে এমন সরাসরি, এত জোরের সঙ্গে কলমে আনতে পারেননি কেউ।

‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’-এ লিখছেন, ‘তুমি ইওরোপী, কোন দেশকে কবে ভাল করেছ? অপেক্ষাকৃত অবনত জাতিকে তোলবার তোমার শক্তি কোথায়? যেখানে দুর্বল জাতী পেয়েছ, তাদের সমূলে উৎসাদন করেছ, তাদের জমিতে তোমরা বাস করেছ, তারা একেবারে বিনষ্ট হয়ে গেছে। তোমাদের আমেরিকার ইতিহাস কি? তোমাদের অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জ– তোমাদের আফ্রিকা?’

টাকও হয় টিকিও হয় গোছের লেখা পড়তে পড়তে ক্লান্ত বাঙালি বিবেকানন্দের এই দিকটাকে নতুন করে ভাবার চেষ্টা করবে কি?

করলে, জাগরণ মঞ্চের চেয়ে কম জেগে ওঠা হবে না সেটা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এফএ

 

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য