artk
১১ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২:২২ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

সংবাদমাধ্যম কি বিদেশমুখী?

পলাশ রাশেদ | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৮৪৮ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ০৪ জানুয়ারি ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২২৩৭ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ০৪ জানুয়ারি ২০১৮


সংবাদমাধ্যম কি বিদেশমুখী? - অসম্পাদিত

নিকি হ্যালি, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসেডর বুধবার সন্ধ্যায়, তার ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের জন্য জাতিসংঘে একটা রিসেপশানের আয়োজন করেন। এই আয়োজনে নিমন্ত্রিতদের তালিকায় ‘বাংলাদেশের নাম নেই’। এই ‘না থাকাটা’ হতে পারতো বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর লিড নিউজ, বিশেষজ্ঞদের মতামত কলামের বিষয়বস্তু অথবা মূলধারার সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়ের উপজীব্য। হয়নি, কিন্তু হওয়া উচিৎ ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে কয়টা সাহসী পদক্ষেপ আছে, তার মধ্যে একটা হিসেবে বিবেচিত হতে পারতো এই আমন্ত্রণ না পাওয়ার কারণটি।

গত ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ তারিখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে মিশর। যাতে নাম উল্লেখ না করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়। সিকিউরিটি কাউন্সিলে ১৫টির মধ্যে ১৪টি দেশ (ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীনসহ) এর পক্ষে ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেয়ায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। অ্যাম্বাসেডর হ্যালি তার এই প্রস্তাব ও এর পক্ষে বাকি সদস্যদের সমর্থনকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপমানজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, “The fact that this veto is being done in defense of American sovereignty and in defense of America’s role in the Middle East peace process is not a source of embarrassment for us; it should be an embarrassment to the remainder of the security council.” সত্যিকার অর্থে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘রুলস অফ বিজনেস’ অনুযায়ী এটা খুবই অনুমিত ফলাফল। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেটো না দিত তাহলেই বরং বিস্মিত হতে হতো। ঠিক ওই মূহুর্তেই এটা বোঝা সম্ভব ছিল না যে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মাথায় যুক্তরাষ্ট্রকে স্মরণকালের সবচেয়ে অপমানজনক কূটনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।

এর পর ২১ ডিসেম্বর, একই প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে তোলে তুরস্ক এবং ইয়েমেন, যেখানে একটা প্রস্তাব পাস করতে শুধু সিম্পল মেজরিটি দরকার হয়, কারো ভেটো দেয়ার ক্ষমতা নেই। বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অ্যাম্বাসেডর হ্যালি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন– “US will be taking names”! জেনারেল এসেম্বলির এই প্রস্তাবের পক্ষে যারা ভোট দিবে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খারাপ সম্পর্কের ঝুঁকি নিতে হবে এবং ভবিষ্যতের সব ধরণের সামরিক ও উন্নয়ন সহায়তা থেকে বঞ্চিতও হতে হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। তাছাড়া, জাতিসংঘ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র যে সবচেয়ে বেশি কন্ট্রিবিউট করে, সেটাও মনে করাতে ভোলেননি হ্যালি। যথারীতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও সরাসরি এবং কূটনৈতিক শিষ্ঠতা বিবর্জিত– “We’re watching those votes. Let them vote against us, we’ll save a lot. We don’t care”.

জাতিসংঘের ইতিহাসে, সাধারণ পরিষদের কোন সম্ভাব্য ভোট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের প্রকাশ্য হুমকির কথা আমার অন্তত জানা নেই। কূটনৈতিক প্রথা ও ভব্যতার দিক থেকে এ ঘটনা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। এইসব বক্তব্য যে ফাঁকা বুলি নয় তা বোঝাতে মার্কিন অ্যাম্বাসেডরের পক্ষ থেকে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের দূতদের এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেয়া হয়। সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট পয়েন্ট– নিকি হ্যালি পরিষ্কার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এই ভোটের ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে নেবেন- "As you know, the General Assembly is considering a resolution about President Trump's recent decision on Jerusalem. As you consider your vote, I encourage you to know the president and the US take this vote personally." এইসব ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জাজনক কূটনৈতিক পরাজয়ের ভিত্তি রচিত হয়।

এখানে বলে রাখা ভাল, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই ক্যাম্পেইন ট্রেইলে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেয়ার এবং সেখানে মার্কিন অ্যামব্যাসি স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই ক্ষমতায় যাওয়ার পর আর ও পথ মাড়াননি। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনার (Two-State-Solution) প্রধান অমীমাংসিত বা বিরোধের জায়গাটাই হচ্ছে জেরুসালেমের অধিকার। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিষয়ে নির্দিষ্ট পক্ষ অবলম্বনের অর্থ হচ্ছে শান্তি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার নিজের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। নিজের বিশ্ব-মোড়ল ভাবমূর্তি বজায় রাখতে গিয়ে কৌশলগত কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রেসিডেন্টই জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। ইসরায়েলের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থনের জায়গা থেকেও কিন্তু তারা কেউ সরে আসেননি। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস (সিনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজেন্টিটিভ) ‘JERUSALEM EMBASSY ACT OF 1995’ নামে একটা আইন পাস করে, যাতে বলা হয় ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামব্যাসি তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তর করতে হবে। অন্যথায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (State Department) বার্ষিক বাজেট অর্ধেক কেটে নেয়া হবে। ওই আইন কার্যকর হওয়ার আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ (Waiver) স্বাক্ষর করেন। তার পর থেকে জর্জ ডাব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা এবং ট্রাম্প পর্যন্ত সবাই নিয়মিত ছয় মাস পর পর এই এ Waiver এ স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন। আশংকা করা হচ্ছে ১ বছর থেকে ২ বছরের মধ্যে ট্রাম্প এই স্থগিতাদেশ আর স্বাক্ষর করবেন না (অ্যামব্যাসি স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন করার জন্য এই সময়টুকু দরকার)। ১৯৯৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টই জেরুসালেমে অবস্থিত ইসরায়েলের পার্লামেন্টে (Knesset) ভাষণ দিয়েছেন, যা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত থাকার (Check) বিপরীতে এক ধরণের পরোক্ষ স্বীকৃতি (Balance). কিন্তু ট্রাম্প এ ধরনের পরিমিতিবোধ, কৌশল বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির আদব-কেতার সাথে একদমই একমত না। তার পলিসি হচ্ছে ‘ধর-মুরগি-কর-জবাই’ ধরনের!

যাহোক, ফিরে যাই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২১ ডিসেম্বরের ভোটে। যদিও প্রস্তাবটি ভালভাবেই ভোটে উৎরে যায়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকি এবং পরোক্ষ সহযোগিতার আহ্বানের ক্ষত ফলাফলে স্পষ্টতই থেকে যায়। এক্ষেত্রে, সদস্য রাষ্ট্রগুলো মোট চার ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়–

প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়– ১২৮টি দেশ
প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়– ০৯টি দেশ
ভোটদানে বিরত ছিল– ৩৫টি দেশ
ভোটে অংশ নেয়নি– ২১টি দেশ

ওই সন্ধ্যায়ই, অ্যাম্বাসেডর হ্যালির পক্ষ থেকে মোট ৬৫টি দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হিসেবে আখ্যা দিয়ে গতকালের রিসিপশানের দাওয়াত দেয়া হয়। তার বিবেচনায়, বিপক্ষে ভোট দেয়া, বিরত থাকা এবং অংশ না নেয়া (০৯ + ৩৫ + ২১) সবাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বন্ধু! ইতোমধ্যে আমরা জানি, বাংলাদেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। ভোটের আগে আমি বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি (অবশ্য তারা কেউই বিশেষজ্ঞ নন, আমার মতই আমজনতা)। আর সবার মতো আমারও মনে হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ এবং মুখরক্ষার পন্থা হতে পারে ভোটদানে বিরত থাকা অথবা ভোটে অংশই না নেয়া। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, আগামী বছরের সম্ভাব্য নির্বাচন এবং ট্রাম্পের মতো একজন লোক যুক্তরাষ্ট্রের মসনদে থাকার পরও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান নিঃসন্দেহে সাহসী একটি পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের সাথে একজন ঈর্ষান্বিত টিনএজারের খুব কমই পার্থক্য আছে। লোকটা ব্যক্তিগত আনুগত্য ছাড়া আর কোন কিছুকেই গুরুত্ব দেয় না, তার কাছে রাষ্ট্রীয় বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, সবকিছুই ব্যক্তিগত।
তাছাড়া ভুলে যাওয়া উচিৎ হবে না, ট্রাম্প এবং হ্যালি প্রকাশ্যে পক্ষে ভোটদাতাদের প্রতি নজর রাখাসহ অনেক ধরনের হুমকি দিয়েছেন। সরকার ফিলিস্তিনের ব্যাপারে দল মত নির্বিশেষে, বহুবছর যাবত লালিত পররাষ্ট্রনীতিকে রাজনৈতিক সুবিধার আশায় জলাঞ্জলি দেয়নি, এটা অনেক বড় ব্যাপার। তাছাড়া এই নিদিষ্ট ভোটে নীরব থাকলে বাংলাদেশকে বা সরকারকে দোষারোপ করারও কোন যৌক্তিক কারণ থাকতো না।

এবার, আসুন দেখি আমাদের গণমাধ্যম বিষয়টিকে কিভাবে প্রচার করেছে। আমি এই বিষয়ে করা ‘হেডলাইন’ যা দেখেছি তাতে তুরস্ক, এরদোয়ান, ইরান, হাসান রুহানি, কাতার, সৌদি যুবরাজ, ট্রাম্প, হ্যালি, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, গুয়েতেমালা, জর্ডানের বাদশাহ, পোপ ফ্রান্সিস, জাপান, মালয়েশিয়া, চীন মিয়ানমার, ভারত যে পক্ষে ভোট দিয়েছে তারও উল্লেখ দেখেছি! একটা শিরোনামও দেখিনি যাতে অন্তত বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়ার সাহসী পদক্ষেপের কথা। এমনকি এ বিষয়ক শিরোনামসমূহে বাংলাদেশ নামটাও আমি দেখিনি। মূলধারার সংবাদপত্রে একই বিষয় নিয়ে লেখা দেশি-বিদেশি-প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের মতামত/কলামেও নেই বাংলাদেশ। আমজনতার প্রশ্ন হচ্ছে– আমাদের গণমাধ্যমও কি তাহলে বিদেশমুখী হয়ে যাচ্ছে? নাকি আসলেই বাংলাদেশের অবস্থান কোন বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে না? বিজ্ঞদের কী মতামত?

কিছুদিন আগেই যেখানে আমরা ‘বন্ধুকে পাশে পেল না বাংলাদেশ’ টাইপের শিরোনাম প্রধান প্রধান পত্রিকায় দেখা গেছে, সেখানে ‘ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার আন্দোলনে বাংলাদেশের সাহসী সমর্থন’ অথবা ‘ট্রাম্পের হুমকিতে টলেনি বাংলাদেশ’ ধরনের শিরোনাম তো হতেই পারতো, তাই না? রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের ‘ভোটদানে-বিরত-থাকা’ নিয়ে পুরো সংবাদমাধ্যমে সাড়া পরে গিয়েছিলো। বুঝে না বুঝেই ভারত-জুজু ছড়িয়ে দিচ্ছিল সংবাদ মাধ্যমের বিজ্ঞ কূটনৈতিক প্রতিবেদকগণ (নাকি অনুবাদকগণ?!)। যদিও ‘ভোটদানে-বিরত-থাকা’ একটি দেশের সুস্পষ্ট অবস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না (আমি ভারতের তোষণ করছি না, যৌক্তিক ফলাফলটাই বলছি, যেটা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্লাসে শেখানো হয়েছিলো)। আর ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং নিশ্চিতভাবেই সাহসী। তাহলে দেশ-বন্দনায় বাধাটা ঠিক কোন জায়গায়- চেতনায় নাকি মেধায়?

লেখক: পেশাজীবী

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য