artk
৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১:২১ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

পদ্মাসেতুর দ্বিতীয় স্প্যান নদীতে নামছে ১৫ ডিসেম্বর

মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১৪৯ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৮১৭ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭


পদ্মাসেতুর দ্বিতীয় স্প্যান নদীতে নামছে ১৫ ডিসেম্বর - বিশেষ সংবাদ

মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে দ্বিতীয় স্প্যান পদ্মায় নামছে ১৫ ডিসেম্বর। ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে স্প্যানটি জাজিরা প্রান্তের ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারের কাছে নেয়া হবে। সেখানে পিলারের বেয়ারিংয়ে ওপর বসিয়ে দেয়া হবে স্প্যানটি। বিজয় দিবসের আগে না হলেও বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই মাথা উচুঁ করে দাড়াবে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দ্বিতীয় স্প্যানটি। সেতুর এ স্প্যান যেখানে বসছে এই খুঁটির ওপরের ভাগে সেই অনুযায়ী তৈরি করতে বিলম্ব হয়ে যায়। এই ‘গ্রাউটিং’ সমস্যার কারণে সিডিউল পিছিয়ে দেয়া হয়েছে বলে দায়িত্বশীলরা নিশ্চিত করেছেন। বিজয় দিবসের আগেই দ্বিতীয় স্প্যান স্থাপনের টার্গেট নেয়া হয়েছিল।

দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানান, আরও দুটি স্প্যান বসানোর মতো খুঁটি (পিয়ার) প্রস্তুত হয়ে গেছে। কিন্তু খুঁটির ওপরে স্প্যানটি বসানোর উপযোগী করা নিয়ে কিছুটা বিলম্ব হয়ে যায়। কারণ ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে যেভাবে স্প্যানটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে এখন তার চেয়ে আরও সময় বেশি লাগছে। ৩৮ নম্বর খুঁটির সঙ্গে দ্বিতীয় স্প্যানটির এক প্রান্ত যুক্ত করতে হচ্ছে। আর স্প্যানটির অপর প্রান্ত বসছে ৩৯ নম্বর খুঁটিতে। একইভাবে তৃতীয় স্প্যানটির (৭সি) একপাশে ৩৯ নম্বর পিলারে এবং অপর প্রান্ত বসবে ৪০ নম্বর পিলারে। এই ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলার তৈরি সম্পন্ন। কিন্ত এর মাথায় ক্যাপের সঙ্গে সেট করা নিয়েই গ্রাউন্ডিং করা হচ্ছে এখন। তাই ১০ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ১৫ ডিসেম্বর স্প্যান রওনা হচ্ছে। এর পর এটি বাসাতে আরও কয়েকদিন লেগে যাবে। তবে কবে নাগাদ দ্বিতীয় স্প্যানটি বসানো হবে তা নিশ্চিত জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে তারা নিশ্চিত করেছেন বিজয়ের মাসেই দ্বিতীয় স্প্যান বসছে। এর তৃতীয় স্প্যান বসবে নতুন বছরে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তৃতীয় স্প্যানটি বসানোর সম্ভাবনার কথা জানায় কর্তৃপক্ষ।

প্রায় তিন হাজার টন ওজনের ‘৭বি’ নম্বর স্প্যানটি ৩৬শ টন ধারণ ক্ষমতার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে পদ্মা নদী পাড়ি দেবে। এ লক্ষ্যে মাওয়া প্রান্তের কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ‘৭বি’ নম্বরের স্প্যানটি পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে এখন।

নতুন হ্যামার কাজ শুরু করেছে: এদিকে পদ্মা সেতুর নতুন যুক্ত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সাড়ে তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতার হ্যামারটি (হাতুরি) পাইল ড্রাইভ শুরু করেছে। এটির সফট ওয়্যার এবং কন্ট্রোল বক্স আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। এ কন্ট্রোল বক্স বিমান আসে। এটি এনে সেট করার পরই সোমবার থেকে পাইল ড্রাইভ করছে। গত ১৭ নভেম্বর এটি জার্মান থেকে মাওয়ায় পৌঁছে। এছাড়া দুই হাজার এবং তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতার আরও দুটি হ্যামার আনা হয়। নতুন হ্যামার দুটি চালু করাই সম্ভব হয়নি। তাই অলস পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে ২৪শ কিলোজুল এবং ১৯শ কিলোজুল ক্ষমতার দুটি হ্যামারেই পাইল ড্রাইভ করে চলেছে।

এক নম্বর খুঁটির কাজ শুরু হচ্ছে: পদ্মা সেতুর ৪২টি খুঁটির মধ্যে অধিকাংশ খুঁটিতেই কাজ চলছে। ইতোমধ্যেই ৪টি (৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০ নম্বর) খুটির কাজ সম্পন্ন হয়েগেছে। এমনকি সর্বশেষ অর্থ্যাৎ ৪২ নম্বর খুঁটির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। কিন্তু এখনও মাওয়া প্রান্তের প্রথম খুঁটির কাজ শুরু করা যায়নি। বৈচিত্র্যপূর্ণ মাটির কারণে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। সর্বশেষ একটি টেস্ট চলছিল যা সফল হতে যাচ্ছে। ১১ ডিসেম্বর এই টেস্ট শেষ হলেই এক নম্বর পিয়ারে পাইল ড্রাইভ শুরুর পথ সুগম হবে।

এদিকে সেতুর বাকি ১৪টি পিলারের চূড়ান্ত ডিজাইনও সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। ছয়টির পরিবর্তে একটি করে পাইল বাড়িয়ে সাতটি করে পাইল প্রয়োজন হতে পারে। এভাবেই নতুন ডিজাইন অনুমোদন দেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন।

এদিকে বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোতের কারণে পলি না জমলেও, এখন শুকনো মৌসুমে নাব্যতা সমস্যা চলছে। নদীতে কাজ চলমান রাখতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আনা নেয়া এবং নদীতে ভাসমান উপকরণ সচল রাখতে ড্রেজিং করতে হচ্ছে।

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে ওপর ‘৭এ’ নম্বরের স্প্যানটি স্থাপনের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে পদ্মা সেতুর প্রথম অবকাঠামো। ‘৭বি’ নম্বর পিলার স্থাপনের মাধ্যমে সেতুর অবকাঠামো আরও বিস্তৃতি লাভ করবে। আর পর্যায়ক্রমে এভাবেই একের পর এক স্প্যান বসানোর মাধ্যমেই পদ্মা সেতু শতভাগ অবকাঠামোতে রূপ নিবে। মূল সেতু ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতুর পুরোটাই নির্মিত হবে স্টিল ও কংক্রিট স্টাকচারে। সেতুর ওপরে থাকবে চাল লেনের মহাসড়ক আর এর নিচ দিয়ে চলবে রেল।

৩৫ লাখ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুত: পদ্মা সেতুর মূল কাজের পাশাপাশি নদী শাসনের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। আর এ জন্য প্রয়োজন পড়বে কমপক্ষে এক কোটি ৩৩ লাখ কংক্রিট ব্লক। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ ব্লক তৈরি হয়েছে। আরও কমপক্ষে এক কোটি ব্লক প্রস্তুত করতে হবে। এ পর্যন্ত নদী শাসনের মোট কাজ হয়েছে ৩৪ ভাগের বেশি। তবে এই সময়ে কাজের অগ্রগতি থাকার কথা ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।

জাজিরা অংশে ড্রেজিংয়ের পর এখন পাথর, বস্তা ফেলা ও ব্লক বিছানো হচ্ছে। কাওয়রাকান্দি ঘাটের উজানে কাজ চলছে এখন। মাঝিকান্দি সিনোহাইড্রো ঘাট থেকে কাঁঠালবাড়ি মেনেম ঘাট পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার উজান পর্যন্ত কাজ হচ্ছে। কাঠাঁলবাড়ির থেকে উজানে বস্তা ফেলা হচ্ছে। এবছরও জাজিরায়ই নদী শাসনের কাজ বেশি হচ্ছে। আড়াই কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার টার্গেট রাখা হয়েছে।

তবে এবছর মাওয়ায় আধা কিলোমিটার এলাকায় নদী শাসনের কাজের টার্গেট ধরা হয়েছে। পদ্মা সেতুন নির্বাহী প্রকৌশলী (নদী শাসন) সারফুল ইসলাম জানান, মাওয়ার মাছ বাজারের আশপাশে এখন ব্লক বিছানোর জন্য মাটি কম্পেকশন করা হচ্ছে। মাছ বাজারের কাছ থেকে ভাটির দিকে আধা কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ সম্পন্ন হবে এ শুস্ক মৌসুমে।

নদী শাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হল নদী ভাঙন রোধ করে মূল সেতু রক্ষা করা। নদী ভাঙন রোধ করা না গেলে এ ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে নতুন নদী সৃষ্টি করবে। এতে দেখা যাবে সেতু থাকবে এক জায়গায়, নদী থাকবে আরেক জায়গায়। তাই নদী শাসন করে এক স্থানেই নদীর অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় ব্লকের সংখ্যা এক কোটি ৩৩ লাখ উল্লেখ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে মোট ৩৫ লাখ ব্লক। যেহেতু মাওয়াতে এখন কাজ নেই, তাই তৈরি ব্লকগুলো নদীর পাড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মাওয়াতে যখন কাজ করা হবে তখন এ ব্লক মাওয়া প্রান্তে নদীতে ফেলা হবে। জাজিরা প্রান্তেও ব্লক তৈরি করে নদীর পাড়ে রাখা হয়েছে।

প্রকৌশলীরা জানান, নদীর গতিপথ বিবেচনা করে ধারনা করা যায় আগামী ৫/৭ বছর পরে কাঠাঁলবাড়ীর দিকে নদী ভাঙন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ভাঙ্গন যাতে না হয় তাই ৮০ মিটার গভীর পর্যন্ত ড্রেজিং করে তার নিচে বালুর বস্তা দেয়া হয়েছে। এ বস্তাগুলো ১৭০ মিটার দীর্ঘ ও ওজনে প্রায় ২৫ মণ কারণ, নদীর স্রোতে যেন বস্তগুলো স্থানচ্যুত না হয় বরং ভাঙ্গনের সময় যেন ঠিক জায়গায় থেকে নদীর তলদেশে বসে যায়।

সেতুর জাজিরা প্রান্তে পাচ্চর থেকে মাঝিকান্দি পর্যন্ত নদী শাসনের কাজ হয়েছে। আর মাওয়া প্রান্তে পুরাতন ফেরিঘাট থেকে শুরু করে কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড পর্যন্ত নদীতে বালির বস্তা ফেলা হয়েছে। তবে, এই বছর নয়, সামনের বছর এই প্রান্তে নদী শাসনের মূল কাজ করা হবে। কারণ, এখানে প্রায় ১০ মিটার চওড়া চর পড়েছে। এদিকে পুরান ফেরিঘাটের উজানে দেড় কিলোমিটার এলাকা নদী শাসন করা হয়েছে। আর আরো উজানে যেহেতু প্রকল্পের অধিগ্রহন করা জায়গা নেই তাই সেখানে নদী শাসন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, প্রথমে নদীর তলদেশ ড্রেজিং করে বড় আকারের বালির বস্তা ফেলে তার ওপর পাথর ফেলা হবে। এরপর জিও ব্যাগ ফেলে ঢালাই করে তার উপর সিসি ব্লক বিছিয়ে নদী শাসনের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে। তবে মূল সেতুর কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর একটি শুকনো মৌসুমে নদী শাসনের বাকি কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে।

নিউজিবাংলাদেশ.কম/এফএ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত