artk
১০ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সোমবার ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

বর্ষপূর্তিতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি
চুক্তির দুই দশকেও শান্তি আসেনি পাহাড়ে

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান সংবাদদাতা | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১৩২ ঘণ্টা, শনিবার ০২ ডিসেম্বর ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৮১৭ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭


চুক্তির দুই দশকেও শান্তি আসেনি পাহাড়ে - বিশেষ সংবাদ

পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই দশকেও পাহাড়ে শান্তি আসেনি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তি চুক্তি করলেও পার্বত্যাঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখনো থামেনি। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাতিল ও চুক্তি সংশোধনের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলন ও ইউপিডিএফ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পাল্টাপাল্টি আন্দোলন আর সংঘাতে আজও উত্তাল পাহাড়ি জনপদ। চুক্তির দুই দশক পূর্তিকে ঘিরে এবারও সমঅধিকার আন্দোলন ও জনসংহতি সমিতি বান্দরবান সহ তিন পার্বত্য জেলায় পাল্টাপাল্টি নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

শনিবার চুক্তির পক্ষে অবস্থানকারী জনসংহতি সমিতি শান্তিচুক্তির ২০ বছর পূতি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, সমাবেশ এবং চুক্তি বাতিলের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলনসহ বাঙালি সংগঠনগুলো কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগেও দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা চলছে। এছাড়াও স্থানীয় রাজারমাঠে সেনা রিজিয়নের উদ্যোগে ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দের সুযোগে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করে চলেছে অস্ত্রধারীরা। চাঁদাবাজি আর অপহরণ পার্বত্যবাসীর জীবনে নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

এদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনকারী আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতির নেতারা এটি মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্য, আশার বাণী আর নয়, চুক্তি বাস্তবায়ন দেখতে চাই। এ সরকারের আমলে চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন হবে, এটি বিশ্বাস করতে পারছেন না জেএসএস নেতারা। ফলে পার্বত্যাঞ্চলে বাড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। থামছেনা অস্ত্রের ঝনঝনানি। আওয়ামী লীগের দাবি, চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা এবং গুমের ঘটনাগুলো।

ভূমি সমস্যার সমাধান ছাড়া শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন কোনোদিনও সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভূমি সমস্যা সমাধানে গঠিত ভূমি কমিশন কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন জেএসএস নেতারা।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মংপ্রু মারমাকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা নিয়ে বান্দরবানে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন জনসংহতি সমিতি ও আওয়ামী লীগের নেতারা। পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা এবং গুমের ঘটনাগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমাসহ জেএসএস নেতারা বলছেন, জুম্ম জনগণ ও পার্বত্যাঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করছি এবং শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছি। কিন্তু সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললেও ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করেনি। শান্তিচুক্তির ধারা অনুযায়ী জেএসএস সকল শর্ত পূরণ করলেও সরকার করেনি, সরকারের উচিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা।

জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে.এস. মং মারমা বলেন, “শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হবে, এমনটি আমরা মনে করতে পারছি না। তারপরও সরকারের উপরে আমাদের আস্থা রাখতে চাই। যেহেতু চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। চুক্তি বাস্তবায়নে যদি সরকার আন্তরিক হয়, তাহলে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি কেন পুনগর্ঠন করা হচ্ছে না। বয়োয়জ্যেষ্ঠ সৈয়দ সাজেদা চৌধুরীকে এখনো চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক করে রাখা হয়েছে। যিনি এখন চলাফেরা করতে পারেন না বয়সের কারণে। দীর্ঘ নয় বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির একটি সভা হয়নি।”

তিনি দাবি করেন, “এমপি নির্ভর রাজনীতি চলছে তিন পার্বত্য জেলায়। এমপির নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিকল্পিতভাবে আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে দুর্বল করে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাই চুক্তি ভঙ্গ করছেন। পার্বত্যাঞ্চলে এমপি নির্ভর রাজনীতি চলমান থাকলে কখনো চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না।”

অপরদিকে শান্তিচুক্তি বাতিল, পাহাড়ি-বাঙালি সমান অধিকার নিশ্চিত এবং ভূমি জটিলতা নিরসন ছাড়া পার্বত্যাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছে সমঅধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তি চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর সংশোধন জরুরি বলে মনে করে চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।

পার্বত্য নাগরিক পরিষদ বান্দরবানের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান বলেন, “পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তি করা হলেও পাহাড়ে শান্তি আসেনি। চুক্তির লক্ষ্য উদ্দেশ্যেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি, পার্বত্যাঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখনো থামেনি। চুক্তির মৌলিক অনেকগুলো ধারা বাস্তবায়নের পরও পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করে চলেছে অস্ত্রধারীরা। যেহেতু চুক্তির ২০ বছরেও পাহাড়ে শান্তি আসেনি, আগামীতেও আসবে না। তিন পার্বত্য জেলায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেশের সংবিধানের আলোকে সকলের অধিকার সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। চুক্তির বর্ষপূর্তিতে কালো পতাকা উত্তোলন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।”

অপরদিকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় জনসংহতি সমিতির শান্তি বাহিনীর সদস্যরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় দুই হাজার শান্তিবাহিনীর সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সরকার তৎকালীন সময়ে অস্ত্র সমর্পণকৃত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি দেয়।

চার খণ্ডে বিভক্ত পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ৭২টি ধারা রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। আর ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়াও বাকি নয়টি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। শান্তি চুক্তির ঘ খণ্ডের ১৭ (ক) ধারা অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ২৩৮টি সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৩৩টি বিভাগের মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ২৮টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশিষ্ট বিভাগগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত থেকে প্রত্যাগত এ পর্যন্ত ১২ হাজার ২২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তাদের জন্য সরকার প্রতিবছর ১৫৫১৪.২৬৯ মে.টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করে থাকে। প্রতিমাসে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষকে ২১.৭০ কেজি চাল এবং অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষকে ১০.৮৫ কেজি চাল প্রদান করা হচ্ছে।

পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। কিন্তু  দুই দশকেও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি থামেনি। অবহেলিত বঞ্চিত এখনো পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠা পাহাড়ি শিশুর ছবিটি বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের মুরুং পাড়া থেকে তোলা জেলা ইউপিডিএফ সভাপতি ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “পার্বত্য শান্তিচুক্তি বর্তমানে মৃতপত্রে পরিণত হয়েছে। চুক্তির ফলে আওয়ামী লীগ সরকার এবং জেএসএসের কতিপয় ব্যক্তি সফলতা পেলেও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে পাহাড়িদের জন্য চুক্তি সফলতা আনেনি, এটি বিফল বলা চলে।”

বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, “চুক্তির বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে সরকার। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্পাদিত হয় পার্বত্য শান্তিচুক্তি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে পাহাড়ে শান্তি আসেনি। অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং চাঁদাবাজিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরো বেড়েছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত যেমন হয়েছে, তেমনটি চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়নও করা হবে। ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি বলে মিথ্যাচারের কোনো যুক্তি নেই। অস্ত্র আন্দোলনসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছেড়ে উন্নয়নের পথে ফিরতে হবে জনসংহতি সমিতিকে। আলোচনার টেবিলে বসে চুক্তি বাস্তবায়নের অন্তরায়গুলো খুঁজে বের করতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “চুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত পাহাড়ি সংগঠনগুলোর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। চাঁদা ছাড়া পাহাড়ে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই সম্পাদন করা যাচ্ছে না। পাহাড়ে উৎপাদিত ফসল, বাগানের গাছ বিক্রি এবং ব্যবসায়ীরা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উভয়কেই চাঁদা দিতে হচ্ছে। আবার পরিবহণ মালিকদেরও বাৎসরিক চাঁদা গুনতে হচ্ছে। একটি পণ্যের ওপরে তিন দফায় চাঁদা আদায় করা হচ্ছে পাহাড়ে। তাহলে শান্তিচুক্তির সুফল কোথায় পাচ্ছে পাহাড়ের জনগণ। আওয়ামী লীগ নেতা মংপু মারমাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। কদিন আগেও চাঁদার দাবিতে ভাড়ায় চালিত যানবাহনের চালককে গুলি করা হয়েছে। পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা এবং গুমের ঘটনাগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/এফএ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য