artk
৮ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সোমবার ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

বিকাশ মজুমদারের গল্প: বিষণ্ণ সুন্দরী

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৭২৭ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ১২ অক্টোবর ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৩২৭ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১৭ অক্টোবর ২০১৭


বিকাশ মজুমদারের গল্প: বিষণ্ণ সুন্দরী - শিল্প-সাহিত্য

বাবা মায়ের পাঁচ সন্তানের মধ্যে ব্রুশালি সব থেকে ছোট এবং সবার থেকে বেশি সুন্দরী। সত্যি কথা বলতে, শহরের সবচেয়ে সুন্দরী বালিকার নাম ব্রুশালি। ছিপনৌকার মত তার রিজু শরীরের বাঁকে বাঁকে আশ্চর্য সৌন্দর্য। সাপের মত চোখের দৃষ্টি, সেখান থেকে আগুন ঠিকরে বের হয়। ব্রুশালি যেন চলমান আগুনের গোল্লা। সব সময় প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর। লম্বা ঘন কালো সিল্কের চুল মেডুসার সাপের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘাড় বেয়ে কোমরে ফনা তুলেছে। ব্রুশালি সবসময় যেন ফুটছে, ফুলছে, দুলছে। যেকোনও সময় কাঁপিয়ে দেবে চারদিকের চরাচর। শহরের অনেকে বলে ব্রুশালি একটা পাগলী। মাথাভর্তি গোবরের সার নিয়ে বেড়ে ওঠা পুরুষেরা ব্রুশালিকে বুঝতে পারে না। যৌনবিকারগ্রস্থ পুরুষদের মনে হয় ব্রুশালির এত সৌন্দর্য তাদের ভোগের নিমিত্ত। ব্রুশালি শুধুই যৌনতা নিবারণের ডিভাইস, সে পাগলী না সুস্থ সেটা ভেবে দেখা পুরুষের চিন্তার মধ্যে পড়ে না।

শহরের সবাই জানে ব্রুশালি ভালো নাচে এবং নাচায়। পুরুষেরা তার প্রতি প্রণয় চাপল্য দেখায়, ব্রুশালি তাদেরকে উড়ন্ত চুমু দিয়ে প্রতি উত্তর দেয়। কিন্তু কীভাবে যেন ব্রুশালি পুরুষের হাত গলিয়ে বের হয়ে যায়। আর তারা সারারাত চুমুর বিষে জ্বলতে থাকে, নীল হয়ে যেতে থাকে। মনে আশা পুষে রাখে আবার একদিন নাচের ফ্লোরে ঠোঁটের সাক্ষাৎ পাবে।

ব্রুশালির বোনেরা হিংসায় জ্বলে পুড়ে যায়। তারা অভিযোগ করে, ব্রুশালির সৌন্দর্যের যত দ্যুতি, মেধার দিকে তেমনি আমড়া কাঠের ঢেকি এবং সে সৌন্দর্যের অপব্যবহার করে পুরুষদেরকে পতঙ্গের মত নিজের দিকে টানে। কিন্তু ব্রুশালি নিন্দুকের মুখে ছাই ঢেলে ক্রমাগত মেধায়, মননে, প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর হতে থাকে। সে ছবি আঁকে, সে নাচে, সে গান গায়, সে মাটি দিয়ে পুতুল বানায়। মানুষের দুঃখ, কষ্টে ব্রুশালির মন আলোড়িত হয়, সে তাদের মঙ্গলের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সে স্বার্থকেন্দ্রিক জগতের মানুষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বাস্তবের সঙ্গে যেন একেবারেই খাপ খায় না। ব্রুশালির বোনদের হিংসা বেড়েই চলে। কারণ তাদের বালকেরা ব্রুশালির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তাদের মনে হয় ব্রুশালি রূপের আঁকশি দিয়ে পুরুষদের বেঁধে রাখে। ব্রুশালিকে তাদের কাছে ডাইনী মনে হয়। কিন্তু ব্রুশালির এসব কিছুতে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনকি বিপন্ন কুৎসিত মানুষের প্রতিও সে অসীম দরদী, ফলে সুদর্শন পুরুষেরা তার প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। তখন ব্রুশালি তার প্রণয় প্রার্থীদের বলে, শরণাগতদের রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। পুরুষের দল মাথা চুলকায়, সুন্দর আঙ্গুল দিয়ে কানের লতিতে হাত বুলায়, বাইরে থেকে আর্ত নিপীড়িতের জন্য হা হুতাশ অনুভব করলেও অন্তরে তাদের কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। এসব দেখে ব্রুশালির খুব রাগ হয়ে যেত। রাগে তার অবস্থা পাগল পাগল।

ব্রুশালির বাবা অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যায় এবং তার মা পাঁচ সন্তানকে অসহায় ফেলে রেখে অন্য পুরুষের সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করে। অসহায় মেয়েগুলো তাদের এক আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেই আত্মীয় কিছুদিন পরে মেয়েদের আশ্রমে দিয়ে দেন। সেখানে তাদের অতি অমানবিক জীবনযাপন করতে হয়। আপনা মাংসে হরিণা বৈরী যেমন, তেমনি সৌন্দর্য ব্রুশালির জন্য কাল হয়ে দেখা দিলো। বোনেরা তাকে হিংসা করে আবার আশ্রমের লোকেরা জ্বালিয়ে মারে। এরকম একটা ঝগড়া বিবাদের মুহূর্তে ব্রুশালির বা হাতের বাহুতে ক্ষুরের পোচ লেগে যায়। একবার বোনদের সঙ্গে মারামারিতে ব্রুশালির ডান পাশের গালে ভীষণ আঘাত লাগে। আঘতের তীব্রতায় ব্রুশালির গালে স্থায়ী কালশিটে দাগ পড়ে যায়। এই দাগ ব্রুশালির সৌন্দর্য ম্লান না করে বরং সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

আশ্রম থেকে মুক্তির প্রথমদিনে ব্রুশালির সঙ্গে আমার দেখা ব্লু মুনে। খুব স্বাভাবিকভাবে সে আমার পাশের সিটে বসল। আমি ছিলাম শহরে সম্ভবত সবচেয়ে অনাকর্ষণীয় পুরুষ।

আমি ব্রুশালিকে জিজ্ঞেস করলাম, পান করবে? সে বলল, “অবশ্যই, কেন নয়?”

গতকাল রাতে আমাদের মাঝে যেসব কথা হয়েছিল সেটা আহামরি কিছু নয়। তবুও ব্রুশালি কোথায় যেন আমার মনে গভীর রেখাপাত করে গেল। কোনও বাড়তি চাপ নেই আমাদের, শুধু দুম করে মেঘ না চাইতেই আস্ত সমুদ্রের মত ব্রুশালি আমাকে পছন্দ করে ফেলল। সে একের পর এক গ্লাস শেষ করে যাচ্ছে, যেন সে আজন্মের তৃষ্ণার্ত। তাকে অনেক কম বয়স্ক দেখাচ্ছিল, তবুও সে কীভাবে যেন বারের বয়দের ম্যানেজ করে ফেলেছে। হয়ত সে একটা ভুয়া আইডি কার্ড বানিয়ে ফেলেছিল মদ্যপানের জন্য। অবশ্য আমি নিশ্চিত ছিলাম না আসলেই সে ভুয়া পরিচয়পত্র বানিয়েছিল কিনা।

ব্রুশালি প্রতিবার আমার পাশের সিটে আমার শরীর ঘেষে বসত। কী জ্বালা! তখন গর্বে আমার ঠিকঠাক নেশা হয় না। কারণ, ব্রুশালি ছিল শহরের সব থেকে সুন্দরী বালিকা। এত সুন্দরী নারী আমি জীবনে দেখিনি। আমি সবসময় ব্রুশালির কোমর জড়িয়ে ধরে থাকতাম এবং চুমু দিতাম। আর ব্রুশালি মাঝে মাঝে আমাকে চমকে দিয়ে চকিত চুমু দিতো। চুরি করে চুমু।

ব্রুশালি আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, আমি কি সুন্দরী?”

আমি বললাম, “অবশ্যই। তবে তুমি সুন্দর থেকেও বেশি কিছু। তোমার বাহ্যিক সৌন্দর্যের থেকে তুমি অন্তর ঐশ্বর্যে মহাধনবান।

আমার পরিচিত সবাই আমাকে আমার সৌন্দর্যের কারণে দোষারোপ করে। সত্যিই তোমার মনে হয়, আমি সুন্দরী?

তোমার সৌন্দর্যের কাছে সুন্দর শব্দটি নিতান্ত অর্থহীন। তোমার সঙ্গে বেমানান। আমি আগেও বলেছি তুমি সুন্দরের থেকে বেশি কিছু যেটার ব্যাখ্যা করা আমার ভাষার দীনতা।

ব্রুশালি তার হাতব্যাগ কাছে টেনে নিলো। আমি ভাবলাম সে বোধহয় রুমাল বা টিস্যু খুজছে। কিন্তু না, সে ব্যাগ থেকে একটা লম্বা পিন বের করল। চোখের পলকে আমি বাধা দেয়ার আগেই ব্রুশালি নাকের মধ্যে পিনটাকে বিদ্ধ দিলো। মুহূর্তে এফোড় ওফোড় হয়ে গেল তার সুন্দর নাকটা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, সেই সঙ্গে আতংক আমাকে গ্রাস করে ফেলল।

এইরকম ভয়ানক পরিস্থিতিতেও ব্রুশালি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে বলছে, “এখনও আমাকে সুন্দরী লাগছে? কেন এখনও আমাকে সুন্দরী মনে হচ্ছে?”

আমি ব্রুশালির নাক থেকে পিন বের করলাম। ফোটা ফোটা রক্ত বেরিয়ে আসছে। আমি দ্রুত তার নাকে রুমাল চেপে ধরলাম। বারের অনেক মানুষ এবং একজন বারটেন্ডার এই দৃশ্য আগাগোড়া দেখছিল।

বারটেন্ডার আমাদের সামনে এগিয়ে আসল। ব্রুশালির উদ্দেশ্যে বলল, “দেখুন ম্যাডাম, আপনি একই ফালতু কাজ আবার করেছেন। এখনি বার ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন। আপনার সস্তা নাটক দেখানোর জায়গা এটা নয়”।

ব্রুশালি বারটেন্ডারকে বলল, “আর চারটা পেগ দিয়ে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও”।

ব্রুশালির উত্তরে বারটেন্ডার আমাকে বলল, দেখুন মিস্টার একিলিস, “আপনি এই সুন্দরী ঝামেলাটাকে এড়িয়ে চলুন”।

আমি বললাম, “সে ঠিক হয়ে যাবে”

ব্রুশালি বলতে লাগল, “এটা আমার নাক, আমার নাক নিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি”

আমি বললাম, “না, ব্রুশালি, তোমার উপর আঘাত লাগলে আমি সমান ব্যথা পাই”।

আশ্চর্য! আমার নাকে পিন ঢুকালে তোমার ব্যথা লাগে?

হ্যা লাগে। তোমার আঘাত লাগলে সত্যি সত্যিই আমি ব্যথা পাই।

ওকে, ঠিক আছে, আমি আর এমন করব না। আসো পান করি, আর গান গাই, আমাদের কোনও চিন্তা নাই।

ব্যথায় কুচকে যাওয়া মুখে সে আমার ঠোঁটে চুমু দিলো আর আমি তার নাকে চেপে ধরে রাখলাম আমার রুমাল। বার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তবুও আমাদের বেরোনোর নাম নাই। তখনো আমাদের সামনে দুই পেগ হুইস্কি এবং একটা টাকিলা। আমরা পান করছি আর খোশ গল্পে মত্ত আছি। তখন আবিষ্কার করলাম ব্রুশালি স্নেহ মমতায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ। সে খুব মুখচোরা লাজুক প্রকৃতির মেয়ে, কখনো মানুষকে তার এই গুণের কথা জানতে দেয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে সে আউলা ঝাউলা হয়ে যায় এবং অপ্রকৃতিস্থ আচরণ করে। অনিন্দ্য সুন্দরি ব্রুশালি আসলে কিছুটা সিজোফ্রেনিক। তিক্ত অতীত তার বর্তমানকে ধংস করে দিয়েছে।

সেই একরাতের পরিচয়ের পরেই ব্রুশালি আমার বাসায় চলে এলো। বিছানায় শুয়ে ব্রুশালি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কখন করতে চাও? এখনি নাকি সকালে? তুমি তো জানো, সকালে পুরুষের উত্তান পতাকাদণ্ডের মত জাতীয়াতাবাদী হয়ে ওঠে।

আমি বললাম, তাহলে সকালেই হবে। আমি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গেলাম। কেন উঠলাম জানি না। আমি সাধারণত সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠি। তবে আজ ব্যতিক্রম। ব্রুশালি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত নারীর সৌন্দর্য অপার্থিব যেটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরে আমিই দ্বিতীয়বার বুঝতে পারলাম। একগুচ্ছ চুল গালের পাশ দিয়ে নেমে গেছে। নাকের ওপর অল্প রক্তের দাগ, তাতে অবশ্য ব্রুশালির সৌন্দর্য কিছুমাত্র ম্লান হয়নি। পরনের কাপড় হাটু পর্যন্ত উঠে গেছে। নিঃশ্বাসের তালে হালকা উঠানামা করছে তার বুক। মনে হচ্ছে আমার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে আছে পথভোলা কোনও নাম না জানা গ্রিক দেবী।

আমি দুইকাপ স্ট্রং কফি বানিয়ে ব্রুশালির মাথার কাছে টি-টেবিলে রাখলাম। হালকা শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটু হেসে ব্রুশালি আড়মোড়া ভেঙ্গে আমার দিকে তাকালো। এত সুন্দর দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি।

ব্রুশালি বলল, “তুমিই প্রথম পুরুষ, যে রাতে এত কাছে থাকার পরেও কোনও শারীরিক সম্পর্ক হয়নি”।

আমি বললাম, “আমাদের সম্ভবত শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর দরকারই নেই।”

ব্রুশালি বলল, “না, আমি এখনই চাই। দাঁড়াও আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রুশালি ফিরে এলো। তাকে দেখতে অপূর্ব লাগছে। তার লম্বা কোকড়ানো চুল, বড় বড় দুইটা চোখ, ভেজা ভেজা ঠোট যেন জ্বলছে। ওহহ মনে পড়েছে, গতকাল রাতে আমার বিছানায় দেখা পথভোলা দেবীর নাম হলো ভেনাস। স্বয়ং প্রেমের দেবী আমার চোখের সামনে, সে আমাকে বিছানায় আহবান করছে।

নিতান্ত অবহেলায় সে গায়ের পোশাক খুলে ফেলতে লাগল। দিকবিদিক ছুড়ে দিতে লাগল এক এক টুকরো কাপড়। নগ্ন মেয়ে মানুষ দেখলে আমার চোখে কিছুটা এলার্জি হয়। সরাসরি তাকাতে পারছিলাম না ব্রুশালির দিকে। ব্রুশালি আমাকে মুক্তি দিতেই হয়ত বিছানার চাদরের নিচে ডুবে গেল।

ব্রুশালির আহ্বান, “আসো, আসো আমার প্রিয়তম”।

আমিও তার ডাকে সাড়া দিলাম। হয়ত আজীবনের ব্রহ্মচর্য পালন করা ভীষ্মও সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারতো না। ব্রুশালি কোনও সংকোচ ছাড়াই উন্মত্ত হয়ে আমাকে চুমু দিচ্ছিল। তার সারা শরীরে আমি মাখামাখি, সাপ জড়াজড়ি করছি। মোচড় খাচ্ছে তার শরীর। আমি তখন শরীরের পরিব্রাজক, ঘুরে বেড়াচ্ছি পাহাড়ে, পাহাড়ের পাদদেশে, তৃণভূমিতে, অলিগলি আর খানাখন্দে। সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ব্রুশালির গরম নিঃশ্বাস ছাড়ছে আমার চোখে মুখে, ড্রাগনের মত আগুনের হলকা দিচ্ছে সে।

চোখে চোখ রেখে ব্রুশালিকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখন বলো, তোমার নাম কী”

নামে কি আসে যায়? তুমি জানো না, সেক্সপিয়র গোলাপের নামকরণে আগ্রহ দেখাননি?

আমি হেসে ফেললাম, আর আমাদের দ্বৈরথ চলতে লাগল তুমুল উদ্দিপনায়।

বালকেরা নাকি কাপড় খুলতে যত আগ্রহী, কাপড় পরাতে নাকি তেমনি আনাড়ি। কাজের পরে নাকি আর হুশ থাকে না।

যাইহোক, ব্রুশালি কাপড়গুলো খুঁজে খুঁজে পরে নিলো আবার আগের মত, যেমন সে এসেছিলো। দুপুরে হরিতকি রেস্টুরেন্টে আমরা দুজনে লাঞ্চ করলাম। তারপরে সন্ধ্যায় তাকে আবার বারে পৌছে দিলাম। কিন্তু তাকে ভুলে থাকা আমার জন্য কঠিন দায় হয়ে গেল। পোড়া মন, ব্রুশালি পোড়ায় সারাক্ষণ। ব্রুশালি আচ্ছন্ন মন নিয়ে দুই দিন কোনও কাজ করতে পারলাম না, অফিসে গেলাম না। এমনকি ঘুম আসতো না। তৃতীয়দিন ক্লান্ত দুর্বল শরীর কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে নিজেও জানি না। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম। দুইদিনের বাসি পত্রিকা পড়লাম। তারপরে গেলাম গোসল করতে। বাথটাবে বরফকুচি দিয়ে, হাতে নিয়ে কুটুমিয়ার তরমুজের শরবত। এমন সময় দরজায় কলিং বেলের শব্দ। দরজা খুলতেই হুড়পাড় করে ঘরে ঢুকলো ব্রুশালি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, তার মাথায় কচুপাতা। কচুপাতার ছাউনি তাকে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা না করে ভিজিয়েছে বেশি।

ব্রুশালি হড়বড় করে বলতে লাগল, “আমি জানতাম তুমি এখন বাথটাবে আছো, প্রকৃতির বালক, তাই তোমাকে ঢেকে দিতে এই কচুপাতা সঙ্গে এনেছি।” সে কচুপাতা আমার গায়ে ফেলে দিলো।

তুমি কিভাবে জানো, আমি এখন বাথটাবে থাকবো?

সে বলল, “আমি জানি।”

এরপর আমি গোসল করতে বাথটাবে নামলেই ব্রুশালি এসে হাজির হতো। আমি বিভিন্ন সময়ে গোসল করতে বাথটাবে থাকলেও ব্রুশালি ঠিকই সেই সময়ে হাজির হতো। এবং সঙ্গে নিয়ে আসত কচুপাতা। তখন আমরা মিলিত হতাম সকাল সন্ধ্যা, দুপুর বেলা।

মদ্যপান করে মাঝে মাঝেই সে বেসামাল হয়ে পড়ত। একদিন তাকে থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনলাম।

ব্রুশালি রাগে ফুলতে ফুলতে বলল, “এই কুত্তার বাচ্চারা, রাস্তায় বের হলেই টিজ করে।” যখন প্রেম নিবেদন করে, তখন বেশ বুঝতে পারি, তারা প্রতি আগ্রহী নয়, তারা চায় আমার শরীর।”

আমিও তোমার প্রতি শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করি। তবে মনের পরিস্থিতিও বুঝতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ পুরুষেরা হয়ত শরীরের ভিতরে মনের নাগাল পায় না।

যাই হোক, আমি ছয় মাসের জন্য শহর ছেড়ে একটা কাজে গিয়েছিলাম। কাজের কাজ কিছুই হলো না। মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ব্রুশালির চিন্তা। একসময় কাজ শেষ না করেই ফিরে এলাম। আমি ভেবেছিলাম সে মনে হয় কোথাও চলে গেছে। তবুও আমি ব্লু মুনে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রুশালি হাজির! ওহহ তাহলে তুমি এসে গেছো?

আমি তার জন্য পেগের অর্ডার দিলাম। আমি তার দিকে তাকালাম। আজ পরেছে ঘাড় ছুয়ে যাওয়া আকর্ষণীয় এক পোশাক। এই পোশাকে তাকে আগে দেখিনি। তার দুই চোখের নিচে পিন আর পিনের মাথায় কাচের টুকরো বসানো।

ওহহ! এখনও তুমি তোমার সৌন্দর্য ধংসের চেষ্টায় লিপ্ত?

আরে না এটাই এখনকার হাল ফ্যাশন। এবার তুমি বোকা হয়ে গেলে। হা হা হা।

পাগল হয়ে গেছো তুমি? আমি চিৎকার দিয়ে বললাম।

ব্রুশালি বলল, “তোমার কথা আমার অনেক মনে পড়ে”

আর কেউ আছে তোমার?

না, আমার আর কেউ নেই, তুমি ছাড়া। জানো, এই পিন লাগাতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে!

হুম জানি, তুমি এটা করেছো বিনা খরচায়। নিজেই নিজের গাল ফুটো করে। এখন মুখ থেকে এই পিনের জঞ্জাল সরাও।

না। এটাই চলতি হাওয়া।

কিন্তু তোমার এত সুন্দর মুখে এসব দেখে আমার নিজের যন্ত্রণা হচ্ছে।

তুমি সত্যিই বলছো?

অবশ্যই।

ব্রুশালি চোখের নিচ থেকে পিনগুলো তুলে হাত ব্যাগে রেখে দিলো।

কেন তোমার এত সুন্দর চেহারাকে খুচিয়ে জখম করছো? যেমন আছে তেমনি থাকতে দাও না!

সৌন্দর্য আসলে কিছুই নয়। এটা ক্ষণস্থায়ী। তুমি জানো না, কুতসিত হয়ে তুমি আসলে অনেক ভাগ্যবান। কারন লোকে তোমাকে সোউন্দর্যের জন্য পছন্দ করে না। তুমি জানো অন্য কোন কারন আছে।

আচ্ছা ঠিক আছে। আমি ভাগ্যবান।

আমি কিন্তু বলিনি তুমি কুতসিত। মানুষ ভুল বুঝে মনে করে তুমি দেখতে খারাপ। তোমার মায়াবী একজোড়া চোখ আছে।

ধন্যবাদ। আসো আরো এক পাত্তর চড়িয়ে দিই।

ব্রুশালি জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এখন কী করছো?”

কিছুই না। আমি আসলে কিছুই করতে পারছি না। কিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছি না।

আমিও কিছুইতেই স্বস্তি পাচ্ছি না।

আমি বোধহয় কখনোই তোমার মত এত অপরিচিত মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারতাম না। এট আসলে ভালো না।

হ্যা ঠিক বলেছো। এটা ঠিক না। এটা অনৈতিক।

আমরা ব্লু মুন ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। মানুষ পলকহীন চোখে ব্রুশালির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দিয়ে চেটে খাচ্ছে।
শহরের সব থেকে সুন্দরী নারী ব্রুশালি। সম্ভবত এত সুন্দরী আমার জীবদ্দশায় আর দেখা হয়নি।

দুজনে হাটতে হাটতে আমার বাসায় চলে এলাম। একটা হুইস্কির বোতল খুলে কথা বলছি। ব্রুশালির সঙ্গে কথা বলার সুবিধা কথা খুজে পেতে কষ্ট হয় না। ঝর্ণার মত ঝরতে থাকে। সে হয়ত একনাগাড়ে কথা বলে যায় আর আমি শুনতে থাকি। হঠাৎ সে বুঝতে পারে সে একাকী কথা বলে যাচ্ছে। একটু লজ্জা পায় হয়ত। তখন সে আবার শুরু করে। ব্রুশালির বিরতিতে আমি কথা বলি। আমাদের কথা তর্ক তুমুল চলতেই থাকে যেন দুজনে রহস্য উন্মোচনে নিয়োজিত দুজনে। কথার দুইটা অর্থ তৈরি করতে আমরা সিদ্ধহস্ত। শব্দের দ্বিতীয় অর্থ খুঁজে ব্রুশালির সেকি হাসি উচ্ছ্বাস, সেটা শুধু ব্রুশালিই পারে। ব্রুশালি যেন দাউ দাউ আগুন। আগুনের দহনে গলে যাই আমি। ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ি ব্রুশালির ঠোঁটে। মিশে যেতে থাকি আমরা পিষে যেতে থাকি চিড়ে চ্যাপ্টা স্যান্ডউইচের মত। শুয়ে থাকি সাপ জড়াজড়ি করে।

হঠাৎ দেখতে পেলাম তার উঁচু গলার জামার নিচে গভীরভাবে কাটা ক্ষতের দগদগে ঘা। এলোপাতাড়ি আঘাতের চিহ্ন।

ওহহ মাই ডগ!! তোমার এখানে কী হয়েছে?

এই তো সেদিন রাতে কাঁচের বোতল ভেঙে এখানে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না? দেখো, আমি এখনো সুন্দরী।

আমি তাকে বিছানায় বসালাম। তারপর চুমু দিলাম তার কপালে।

ব্রুশালি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে হাসতে লাগল। “ কিছু মানুষ প্রতি রাতে তিন হাজার টাকায় আমার এই মসৃণ চামড়া আর মাংশ কিনে নেয়। আমি তাদের সামনে নিজেকে উন্মোচন করে দিই। মাংশের তুফান দেখে কিছু খদ্দের বিনামেঘে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে প্রবেশ পথেই আছাড় খায়। কিন্তু মন্দির দর্শনের টাকা আর ফেরত দিই না। দারুন না বিষয়টা?

হুম বিষয়টা দারুন কিন্তু নিদারুণ।

ব্রুশালি, ছিনালি কম কর। আমি তোরে ভালবাসি। কেন নিজেকে ধরংস করিস? তুই আমার জীবিত একমাত্র প্রিয় মানুষ।

শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম ব্রুশালিকে। সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার চোখের জল আমার ঘাড়ে রেখার মত নিচে নেমে যাচ্ছে। মেডুসার মত চুল আমার পাশে ছড়ানো। মনে হচ্ছে ব্রুশালির দিকে তাকালে আমি পাথর হয়ে যাবো। পাথর না হয়ে আমি প্রেমিক হয়ে গেলাম। সেই রাতে আমরা ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের মত ধীর থেকে দ্রুত লয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলাম।

সকালে আমার আগেই ব্রুশালি ঘুম থেকে জেগে নাস্তা বানালো। তাকে স্নিগ্ধ, প্রশান্ত দেখাচ্ছিল, চোখে মুখে সুখের জেল্লা। শোবার ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছি, ব্রুশালি গুনগুন করে গাইছে “ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে”। আমি তার সুখ অনুভব করতে পারছিলাম। নাস্তা সাজিয়ে ব্রুশালি ডাক দিলো। আমি তখন জাগরণে অচেতন। সে আমার শরীরে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে বলল দ্রুত ডাইনিং টেবিলে আসো। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

ব্রুশালিকে আমি বিকেলের দিকে তার কর্মস্থলে পৌঁছে দিতে গেলাম। আজ যেন ঢাকা শহরের রাস্তায় জ্যাম কম। ঠ্যাঙখোড়া ভিক্ষুক অনায়াসে রাস্তা পার হয়ে গেল। অভিজাত উত্তরাতে বাস করা পাখিরাও ফিরে এসেছে নিজস্ব গাছে। সংরক্ষিত পার্কে হাঁটতে বের হওয়া বুড়ি তার মৃত স্বামীর ফ্ল্যাট বিক্রি করে কত টাকা পাবে তাই নিয়ে দালালের সঙ্গে দরাদরি করছে। আমরা হেঁটে যাচ্ছি ওয়াকওয়ে ধরে। দুজনে চুপচাপ হাঁটছি শুধু। নিরবতা উপভোগ করছি। চুপ থেকেও চলছে সফল যোগাযোগ। পাশের ফাস্টফুডের দোকান থেকে কিনে আনা স্যান্ডউইচ, চিপস এবং সফট ড্রিংকসের বোতল নিয়ে দুজনে ঘাসে বসলাম। কি জানি কেন যেন, আদিমতা ছাড়াই ভালো লাগছে এই হাওয়ায় ভাসতে। আমাদের কোনও চিন্তা নাই, আমার ঘরে ফেরার তাড়া নাই। ব্রুশালি এক ফাঁকে অফিসে বলে দিয়েছে তার আজ ভীষণ জ্বর। অফিসে যেতে পারবে না।

ব্রুশালি আর আমি ফিরে এলাম বাসায়। রাতে ইলিশ ভাজি, চিকন করে আলুভাজি আর পাতলা মশুরের ডাল রান্না করলাম। খেলাম দুজনে।

আমাকে যেতে হবে পাশের শহরে একটা কাজে। কাজ চাপ ছিল ভীষণ। এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরতে পারলাম না। ফিরতে ফিরতে প্রায় দশদিন লেগে গেল। সোজা ব্লু মুনে চলে গেলাম। আমি বসে আছি আর ব্রুশালির জন্য অপেক্ষা করছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। ব্রুশালির দেখা নাই। একের পর এক পেগ ঢালছি গলায় প্রতিক্ষার জ্বালা মেটাতে। আলো ঝাপসা হয়ে এলে বার টেন্ডার এসে বলল, “আপনি যার জন্য অপেক্ষা করছো সে আর ফিরবে না কোনওদিন”

আমি বললাম, কেন সে আসবে না?

সত্যিই জানেন না কী হয়েছে?

না, জানি না তো, কী হয়েছে?

আত্মহত্যা। আপনি চলে যাওয়ার পরেই ব্রুশালি আত্মহত্যা করেছে। মদের বোতল ভেঙে কাঁচের ভাঙা অংশ নিজের গলায় চালিয়ে দেয় সে। গতকালই তাকে কবর দেয়া হয়েছে। মরার আগে সে বার বার  আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিল।

নিউজবাংলাদেশ.কম/একিউএফ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য