artk
৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রোববার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১:৩৬ অপরাহ্ন
ব্রেকিং
টানা চতুর্থবার জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হলেন অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল                    

শিরোনাম

মদের আখড়া ভেঙে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১৩৮ ঘণ্টা, বুধবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭


মদের আখড়া ভেঙে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো - ফিচার

সন্ধ্যা হলেই বেঁজে উঠতো বাদ্য-যন্ত্র। ভিড় জমতো মদের ক্রেতার। গান-বাজনা আর হৈ-হুল্লোড়ে ঘরে ঘরে বসতো মদের আসর। মাতাল হয়ে অনেকেই অশ্লীল আচরণ করতো ঘরের ঝি-বৌদের সঙ্গে। কারো কারো মাতলামি আর চিৎকারে পাড়া-প্রতিবেশীরাও ছিল অতিষ্ঠ। মাঝে মাঝে ঘটতো ভাঙচুর ও মারামারির মতো ঘটনা।

চার বছর আগে গৌরীপুর বালুয়াঘাট ঋষিপাড়ার প্রতিদিনের সন্ধ্যার পরের চিত্র ছিল এটি। কিন্তু সময় বদলে গেছে। চার বছর পর এখন ঋষিপাড়ার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আর এখানে মদের আসর বসে না। সন্ধ্যার পর প্রতিটি ঘর থেকে ভেসে আসে শিশুদের পড়াশোনার কলরব। প্রতিটি ঘরের শিশুরা এখন স্কুলে যায়। ঋষিপাড়ার পুরোনো পরিবেশ বদলে দেয়ার কারিগর হিসাবে যারা কাজ করে গেছেন তাদের একজন হলেন এখানকার বাসিন্দা পঞ্চনন্দ ঋষির স্ত্রী লক্ষ্মী রানী।

নিউজবাংলাদেশকে তিনি জানান, রাতে মদ বিক্রির কারণে ঘুম হতো না। পুলিশের বুটের শব্দ পেলেই শুরু হতো দৌড়া-দৌড়ি। মাতালরা ঘরের মেয়েদের সাথেও অশ্লীল আচরণ করতো। একদিন বড় ছেলে পলাশ এসে বলে মা এই ব্যবসা বন্ধ করো। আমরা অন্য কাজ করে ভাত-জোটাবো। ঘরে মা-বোন থাকে। মানুষজন নানা বাজে কথা বলে বেড়ায়। ছেলের কথাগুলো মনে নাড়া দেয়। পরের দিন কথা বলি ঋষিপাড়ার মানো রানী, সাথী রানী, কাজলী ও জোৎস্না রানী সাথে। তারাও এই ব্যবসা বন্ধ করার পক্ষে সায় দেন। একঘর দুইঘর করে খবরটা ছড়িয়ে পড়লে বাড়ির পুরুষরাও নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করলেন। এরমধ্যে সহযোগিতার হাত বাড়ায় প্রতিবেশী সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল-আমিন। তারপর পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একদিন আমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেই মদ বিক্রি বন্ধের। পুরুষরাও মদ সেবন ত্যাগ করে ভেঙে ফেলে মদের চুল্লিগুলো।

তিনি আরো জানান, মদ বিক্রি ছেড়ে দেয়ার পর অভাবের মধ্যেও শান্তিতে আছি। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিছি। স্বামী ও দুই ছেলের আয়ে এখন সংসার চলে।

জানা গেছে, ঋষিপাড়ায় প্রায় চল্লিশটি পরিবারের দেড়শতাধিক নারী-পুরুষের বসবাস। পরিবারগুলো প্রধান পেশা ছিল মদ উৎপাদন ও বিক্রি। ১২টি মদের চুল্লি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার লিটার মদ উৎপাদন হতো। তখন তারা পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতো। কিন্তু মদের কারণে গত ৪ বছরে তাদের সম্প্রদায়ের ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মদ বিক্রি বন্ধ হওয়ার পর তাদের জীবিকায় পরির্বতন এসেছে। পুরুষরা চামড়ার ব্যবসা, দিনমজুরি, নরসুন্দর ও নারীরা পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে।

জিতেন্দ ঋষির স্ত্রী মানু রানী বলেন, “মদের চুলা নেই। ২টি গরু আর ১টি ছাগল পালন করে সংসার চালাই। দিন ছেলে আর দুই মেয়ের সংসার। বিধবা হলেও ভাতা পাই না কোনো। কষ্টেই দিন কাটে তারপরেও মদের চুলায় আগুন দেবো না।”

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় ঋষিপাড়ার বেশিরভাগ ঘরগুলো ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। কাঁদা-মাটির নোংরা পথ পেরিয়ে পাড়ার ভেতরে ঢুকতেই ঘরগুলো থেকে ভেসে আসছিল শিশুদের পড়াশোনার কলরব। কথা বলে জানা যায়, বাড়ির মাত্র ১০০ গজ দূরে দুটি স্কুল থাকলেও শিশুদের স্কুলে পাঠাতে হবে এমন ভাবনা অভিভাবকদের ছিল না। তবে এখন ঋষিপাড়ার প্রায় ২০টি শিশু এখন স্থানীয় বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করে। কিন্তু অভাব অনটনের কারণে তারা ঠিকমতো খরচ চালাতে পারে না । এমনকি আসন্ন দুর্গাপূজায় এসব পরিবারের অধিকাংশ শিশু নতুন জামা কিনতে পারেনি বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

এরই ফাঁকে ঘুরতে ঘুরতে নয়ন মনির ঘরে উঁকি দিতেই দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। ছোট্ট ঘরটিতে একটিমাত্র কুপিবাতি নিয়ে পড়তে বসেছে নয়ন মনির তিন সন্তান স্বপ্না, রত্না ও জয়। পাশে বসে সন্তানদের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন মা জয়ন্ত রানী।

তিনি বলেন, “মদ বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বামীর একার আয়ে তিনবেলা ভাত জোটে না। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। অভাবের কারণে কেরোসিন কিনতে পারি না। সন্তানদের পড়ার জন্য কুপিবাতিটাও এনেছি ধার করে। তবে এতো অভাবের মাঝেও ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী স্বপ্নার স্বপ্নটা একটু বড়ই মনে হলো।

নিউজবাংলাদেশকে সে জানায়, পড়াশোনা করে ডাক্তার হতে চায়। শিশুদের পড়াশোনার একই চিত্র দেখা গেল প্রতিবেশী সীতা রানী, মেঘা ঋষি, সীতা রানী, গোবিন্দ ঋষি, রঞ্জন ঋষিসহ আরো বেশ কয়েকটা পরিবারের ঘরেও।

সীতা রানী বলেন, পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে তিন সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছি। বড় মেয়ে পারুল ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়।

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক রনজিৎ কর নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “ঋষিপাড়ার বাসিন্দারা মদ বিক্রির পেশা বন্ধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকাররে উচিত এদের ক্ষুদ্র ঋণ ও আত্ম কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা। পাশাপাশি এসব পরিবারের শিশুরা যেনো স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে সে বিষয়েও সরকারের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।”

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সদস্য এইচএম খায়রুল বাসার নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “ঋষিপাড়ার শিশু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এগিয়ে নেয়ার জন্য সহযোগিতা করা হবে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তার নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “মদের ব্যবসা বন্ধ করে ঋষিপাড়ার বাসিন্দারা প্রশসংনীয় কাজ করেছে। তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/আরআইআর/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য