artk
১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ৩:৪৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

একখণ্ড আকাশের নাম জহির রায়হান

রুদ্র রুদ্রাক্ষ, | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১০১ ঘণ্টা, শনিবার ১৯ আগস্ট ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৯৩৮ ঘণ্টা, রোববার ২০ আগস্ট ২০১৭


একখণ্ড আকাশের নাম জহির রায়হান - অসম্পাদিত

জহির রায়হান বাংলাদেশের একখণ্ড আকাশের নাম। যে আকাশে মেঘ, জমে সূর্য ওঠে আবার রাত্রি নেমে আসে তার চিরকালীন অন্ধকার নিয়ে। মূলত এই গুণী ছিলেন একাধারে একজন সাংবাদিক, ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

বহুমাত্রিক প্রতিভাধর এই মানুষ ১৯৩৫ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ফেনি জেলার মাজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শহিদুল্লা কায়সারের ছোট ভাই জহির কলকাতায় মিত্র ইনস্টিটিউটে এবং পরে আলিয়া মাদরাসায় পড়াশুনা করেন। ভারত বিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ গ্রামে চলে আসেন।

তিনি ১৯৫০ সালে আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন এবং ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হন। তিনি আইএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। অল্প বয়সেই জহির রায়হান কমিউনিস্ট রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। তিনি কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন অর্থাৎ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চিঠি ও সংবাদ পৌঁছে দিতেন। গোপন পার্টিতে তার নাম রাখা হয় ‘রায়হান’। তার আসল নাম ছিল জহিরুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে তিনি জহির রায়হান নামে পরিচিত হন। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি যে ১০ জন প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তিনি তাদের অন্যতম। অন্যদের সঙ্গে তাকে মিছিল থেকে গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ করা হয়।

ছাত্রজীবনেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৩৬২ বঙ্গাব্দে তার প্রথম গল্পসংগ্রহ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। লেখক হিসাবে জহির রায়হানের চিন্তাচেতনা ছিল ভিন্ন, একটু আলাদা মাত্রার। জহির রায়হান মূলত নাগরিক লেখক, নগরকেন্দ্রিক ঘটনাবলী তার উপন্যাসের বিষয়। সাতটি উপন্যাসের মধ্যে কেবলমাত্র `হাজার বছর ধরে` ছাড়া অন্য সবের পটভূমি শহর বা নগর।

আরেক ফাল্গুন ও আর কতদিন-এই দু`টি উপন্যাসই নগরকেন্দ্রিক, উপন্যাস দু`টিতে ইতিহাস, রাজনীতি, আন্তর্জাতিকতা, যুদ্ধবিরোধিতা, সংগ্রামী জীবন এবং আগামীদিনে একটি শোষণ-বঞ্চনামুক্ত নতুন পৃথিবী গড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে। `আরেক ফাল্গুন` এদেশের ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। জহির রায়হানের রাজনৈতিক সচেতনারই উজ্জ্বল সাক্ষ্য `আরেক ফাল্গুন।`

`শেষ বিকেলের মেয়ে`ই মূলত জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস। এতে নগরপ্রধান মধ্যবিত্ত জীবনের প্রেম ও মনোবিকলন স্থান পেয়েছে। `বরফ গলা নদী`ও একটি সার্থক উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র জহির রায়হান দরদ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এটিও নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের হতাশা, ক্লান্তি, টানাপোড়েনের উপন্যাস।

অসাধারণ মুন্সিয়ানা দিয়ে জহির রায়হান তার ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মধ্যে যেভাবে আবহমান বাংলার স্বকীয়তা ও ধারাবাহিকতাকে বেঁধেছেন, এক কথায় তা অসামান্য। বাংলা সাহিত্যে এমন কালজয়ী উপন্যাস খুব বেশি নেই।

শুধু চলচ্চিত্রকার নয়, লেখক হিসেবেও জহির রায়হান তখন জনপ্রিয়তার দিক থেকে তুঙ্গে। গাজী শাহাবুদ্দিন মনু তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। মনু তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতেন একটা। নাম ছিল ‘সচিত্র সন্ধানী’। এতে নিয়মিত লিখতেন জহির রায়হান। তখন বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা বের হওয়ার রেয়াজ চালু হয়েছিল। কলকাতার পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যা দেখেই এই ধারা চালু হয়। সে বছর একুশে ফেব্রুয়ারির কিছু আগে এমনই বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা হবে। গাজী শাহাবুদ্দিন মনুও তখন সচিত্র সন্ধানীর ঈদ সংখ্যার জন্য জহির রায়হানকে দিয়ে লেখাবেন। কিন্তু জহির রায়হান নানা কাজে ব্যস্ত। তাকে পাওয়া যায় না কিছুতেই।

এমন সেলিব্রেটি লেখককে কিছুতেই ধরতে পারছিলেন না গাজী শাহাবুদ্দিন মনু। এক পর্যায়ে তিনি ‘সচিত্র সন্ধানী’র ঈদ সংখ্যায় লেখার জন্য জহির রায়হানকে একরকম অপহরণ করলেন! তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, একটা ঘরে ঢুকিয়ে বললেন, সাত দিনের মধ্যে উপন্যাস লিখতে হবে। দরজা বন্ধ করে দিয়ে চা, সিগারেট, যা লাগে সব দিলেন। বললেন, যা চাই সব পাবে, শুধু বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। কারো সাথে যোগাযোগ নেই। এভাবে গাজী শাহাবুদ্দিন মনু তাকে দিয়ে একটা উপন্যাস লেখালেন। জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস, বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ- ‘হাজার বছর ধরে’ এভাবেই লেখা হয়েছিল।

জহির ১৯৫২ সালে ফটোগ্রাফি শিখতে কলকাতা যান এবং প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনও আসেনি’ মুক্তি পায়। তার পর একের পর এক তার নির্মিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে, কাজল, কাচের দেয়াল, বেহুলা, জীবন থেকে নেয়া, আনোয়ারা, সঙ্গম এবং বাহানা। জীবন থেকে নেয়া ছবিতে প্রতীকী কাহিনির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করা হয় এবং জনগণকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ছবিটি উভয় বাংলাতেই মুক্তি লাভ করে।

তিনি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা দ্য উইকলি এক্সপ্রেস প্রকাশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এ ছাড়া তিনি কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য তিনি আদমজি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তাকে বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

১৯৭১ সালে জহিরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রখ্যাত লেখক শহিদুল্লা কায়সারকে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা তার বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি খবর পান যে, শহিদুল্লা কায়সারকে ঢাকার মিরপুরে রাখা হয়েছে। তিনি তাকে উদ্ধারের জন্য সেখানে যান। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি। ওই দিনটি জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/আরআরবি/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য