artk
৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭, ২:২০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

১৫ আগস্ট শুধুই কী মুজিব হত্যা

শাহরিয়ার সোহেল |
প্রকাশ: ০৯২৫ ঘণ্টা, শনিবার ১৯ আগস্ট ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৯৩৭ ঘণ্টা, রোববার ২০ আগস্ট ২০১৭


১৫ আগস্ট শুধুই কী মুজিব হত্যা - অসম্পাদিত

‘হাজার সিরাজ মরে

হাজার তাহের মরে

হাজার মুজিব মরে

বেঁচে থাকে চাটুকার
পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে উঁইপোকা
বেঁচে থাকে সাপ

খুনের দোহাই লাগে
দোহাই ধানের
দোহাই মেঘের আর বৃষ্টি জলের
দোহাই গর্ভবতী নারীর দোহাই
এ মাটিতে মৃত্যুর অপচয় থামা!’
(হাড়ের ও ঘরখানি/রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ)

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য এক কলঙ্কময় দিন, এক নিষ্ঠুরতম রাত্রি। এ ক্ষণটি শুধু মুজিব হত্যা নয়, এ বর্বরোচিত সময়টি সকল বাঙালিকে হত্যা করার মতোই কলঙ্কজনক, নির্দয়, নিষ্ঠুর, নির্মম। ১৫ আগস্ট শুধু মুজিব হত্যা নয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন থেকে মুক্তি দেন। অথচ তাকেই নিষ্ঠুরতমভাবে হত্যা করা হলো। জাতির ভাগ্য থেকে এ কলঙ্ক কোনোদিনই মুছবে না।

১৯৭১ এ নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনা, জেল-জুলুম ও নির্যাতন ভোগ করে এ দেশের মানুষ বুঝতে পারে স্বাধীনতা ছাড়া মুক্তি আসবে না। এর জন্যে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক নেতারা সে সময় জনগণকে সংগঠিত করে। জনগণও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আস্থা স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। অবশেষে বিজয় অর্জিত হয়।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সবসময় আমাদের নানা দিক দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা তাকে কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় পাকিস্তান সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

তার ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, “...এরপর যদি একটা গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে; এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু-আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি-তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। যে পর্যন্ত আমার এ দেশ মুক্ত না হচ্ছে, ততদিন খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হলো। কেউ দেবেন না। মনে রাখবেন কর্মচারীরা, রেডিও যদি আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে টেলিভিশনে যাবেন না।

পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে; এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে। এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা চলেছে, বাঙালিরা বুঝে শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন; এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানূষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

৭ মার্চ ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ঘোষণা বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনটি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীনতার পবিত্র সংগ্রামে, বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনে প্রাণ দিয়েছে অগণিত মুক্তি সংগ্রামী। তিনি স্বাধীনতার জন্য সকলকে তৈরি হওয়ার আহ্বান জানান। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সকল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। সমস্যা সমাধানের নামে আলোচনা করতে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

পরে এসে যোগ দেয় পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো। দশ দিন ধরে আলোচনার নামে চলে প্রহসন। এ সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সুকৌশলে সেনাবাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র এনে বাঙালিদের দমন করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এরপর ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় কোনো রূপ ঘোষণা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন। যাওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে যান।

পাকিস্তানে সৈন্যরা ২৫ মার্চের মধ্যরাতে নিরীহ ও নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। তারা ট্যাংক, ভারী কামান ও নানাবিধ আধুনিক অস্ত্র নিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে।

তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল আক্রমণ করে। এ ছাড়া শিক্ষকদের বাসগৃহে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থানে, বিভিন্ন দলীয় কার্যালয়ে তারা বর্বরোচিত হামলা চালায়। এ সব স্থানে বাঙালি পুলিশ, ই পি আর বাহিনী, বাঙালি সদস্য, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। অন্যান্য স্থানেও তারা নির্মম হত্যাকা- শুরু করে। বাড়ি-ঘর, দোকানপাট ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয় ও লুটপাট করে। বিদেশে সংবাদ প্রেরণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। ঢাকা শহর বধ্যভূমি ও ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল ‘কাল রাতে’ পরিণত হয়। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর দেশ স্বাধীন হয়। এর ভেতর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নানা প্রকার নির্যাতন হয়। গ্রেফতার হন তিনি। কিন্তু বাঙালি জাতিকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় শয়তানের দোসররা। দেশ নবজন্ম লাভ করে। সরকার গঠিত হয়। চমৎকারভাবে দেশ উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে। কিন্তু শয়তানের দোসররা সশরীরে চলে গেলেও তাদের প্রেতাত্মা রেখে যায়। দেশের উন্নয়ন তাদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। ষড়যন্ত্র গভীরতর হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হয়।

শুধু জাতির জনক নয়, তার পরিবারের সকলকে নির্মম-নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। জাতির জন্য এ শুধু কলঙ্কের ইতিহাস নয়, জাতি এ শোক কখনো ভুলতে পারে না। দেশের উন্নয়ন অবরুদ্ধ হয়। সে উন্নয়নের প্রকৃত ধারায় জাতি আজও যেতে পারেনি। ১৫ আগস্ট শুধু মুজিব হত্যা নয়। একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আর জাতির কপালে এমন এক কলঙ্কের তিলক পরিয়ে দেয়া হয়েছে, যা কখনো মুছবে না। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি তথা সকল মূল্যবোধকে ধ্বংস করা হয়েছে। দেশকে চিরতরের জন্য পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। তবু এক মুজিব চলে গেলেও তার আদর্শে গড়ে উঠেছে এ দেশের কোটি মুজিব। তারাই একদিন শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে বাস্তবে রূপদান করবে এমন প্রত্যাশা যথার্থ।

-আমি সাক্ষী। লিখে রেখো এ আমার নাম।
তেরোশ’ বিরাশি সন। মেঘার্ত শ্রাবণ। শেষ রাত।
অকস্মাৎ! -বৃষ্টি নয়, ঘটে গেলো রাষ্ট্রস্বপ্ন থেকে রক্তপাত।
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের মতো ব্যাপ্ত ছিলো যাঁর বুক-
জাতির পিতার- বিদ্ধ হলো উত্তপ্ত বুলেটে।
দেহ শুধু দেহ নয়-ইতিহাস, মূল্যবোধ, শ্রেয়-
ভেসে গেলো বাংলাদেশ রক্তের প্লাবনে-অন্তিম শ্রাবণে।
(আমি সাক্ষী/সৈয়দ শামসুল হক)

নিউজবাংলাদেশ.কম/এফএ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত