artk
১০ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সোমবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৩:৫৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ভালোর কলকাতা, মন্দের কলকাতা

মামুন অর রশিদ | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২১৫০ ঘণ্টা, বুধবার ০২ আগস্ট ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১১৫১ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ০৩ আগস্ট ২০১৭


ভালোর কলকাতা, মন্দের কলকাতা - অসম্পাদিত

গন্তব্য কলকাতা। ভোর ৬টায় খুলনা থেকে বেনাপোলগামী ট্রেন। সাড়ে ৫টার মধ্যে খুলনা রেলস্টেশনে পৌঁছাতে হবে। ঘড়িতে ভোর ৪টার এলার্ম দিয়ে একটু সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু এলার্ম বেজে উঠার ২০ মিনিট আগেই ঘুম ভেঙে যায়। চারিদিকে তখনো বেশ গাঢ় অন্ধকার। শুধু রাস্তার সোডিয়াম লাইটগুলো জ্বলছে এবং ঘুঘরু পোকার ডাক পাওয়া যাচ্ছে। ঘরের বাতিটা জ্বালিয়ে ঝটপট উঠে পড়ি। ফ্রেশ হয়ে ফজরের নামাজ আদায় করি। এরপর সহকর্মী মৌসুমি আর শিক্ষার্থী উজ্জলকে ফোন করে জাগিয়ে দিই। ঝটপট ব্যাগপত্র-লাগেজ গুছিয়ে আর পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেমে আসি পথে। সঙ্গে কিছু প্যারাসিটামল, স্যালাইন আর পানির বোতল নিতেও ভুল করি না।

ঘড়ির কাটায় যখন ঠিক ৫টা তখন বাসা থেকে রওনা হলাম খুলনা রেলস্টেশনের উদ্দেশে। নিরালা মোড়ে পৌঁছে দেখি রাস্তাঘাট একদম নির্জন। চারদিকে তখনও অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। দু-একজন মানুষ ফজরের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাচ্ছেন। কিছু মানুষ মালগাড়ি নিয়ে গল্লামারীর দিকে যাচ্ছে সোনডাঙ্গা থেকে কাঁচামাল আনতে। দু-একটা যাত্রী বোঝাই ইজিবাইক শা শা শব্দ করে চলে যাচ্ছে রেলস্টেশনের দিকে। সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলাম একটি রিকসা। পরে বাসা থেকে বের হওয়া মৌসুমিকে রিকসায় উঠিয়ে যাত্রা করলাম রেলস্টেশনের দিকে।

ঠিক সাড়ে ৫টায় রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। তখনও আমাদের ট্যুরগাইড ও শিক্ষার্থী উজ্জল স্টেশনে এসে পৌঁছায়নি। উজ্জলকে ট্যুরগাইড বলার কারণ, দাদু ও দুই কাকার বাসা কলকাতেই হওয়া জন্য সে বহুবার সেখানে গেছে। কলকাতার অলিগলি তার সব জানার মধ্যে। আমি টিকিট কাটার জন্য প্লাটফর্মের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গেলাম। এতো ভোরে গিয়েও টিকিট কাউন্টারের লাইনে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে ঠাঁই পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে উজ্জল তার বাবাসহ স্টেশনে হাজির হলো। আমি তিনটা টিকিট কেটে নিয়ে আসলাম। পরে উজ্জলের বাবাকে বিদায় জানিয়ে আমরা তিনজন ট্রেনে উঠে পড়লাম। সকাল ৬টা বাজতেই প্লাটফর্মে বাঁশি বেজে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন বেনাপোলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল।

বাতাসের বেগে ধেয়ে চললো ট্রেন। ট্রেনের ভেতরে মৌসুমির আনা নাস্তা খেয়ে আর গল্প-আড্ডার মধ্য দিয়ে আমরা একে একে ঝিকরগাছা, নাভারন ও শার্শার স্টেশন অতিক্রম করে যখন বেনাপোল রেলস্টেশনে পোঁছালাম তখন ঘড়ির কাটায় সকাল সাড়ে ৮টা। রেলস্টেশন থেকে নেমে ইজিবাইকে চেপে মিনিট ১০ পরেই আমরা কাঙ্খিত সীমান্ত বন্দরে পৌঁছালাম। দেখলাম রাস্তার দুপাশে অপেক্ষমান মালবাহী ট্রাকের বিশাল সারি। বেনাপোল দেশের প্রধান স্থলবন্দর। আস্তে আস্তে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগলো। কেউ যাচ্ছে ভারতে ভ্রমণের জন্য, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ বা যাচ্ছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। কেউ আবার ভারতে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে।

সীমান্ত পারাপারে মানুষের সহায়তা করার জন্য রয়েছে নানা রকম মানি এক্সেঞ্জার ও এজেন্ট কমিশনের অফিস। তারা পাসপোর্ট প্রতি দুই থেকে তিনশত টাকার বিনিমিয়ে ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ করে এনে দেয়। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের লাইনের ভিড়ে দাঁড়ানোর চেয়ে কিছু টাকার বিনিময়ে এই সুবিধাটুকু নেয়া যায়। তবে অনেক সময় সাধারণ মানুষ তাদের খপ্পরে পড়ে নানা রকম হয়রানির শিকারও হয়। আমারও একরম এক পরিচিত এজেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছালাম। সেখানে কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পূর্ণ করে অবশেষে সকাল সাড়ে ৯টায় ভারতের মূলভূখণ্ডে প্রবেশ করি।

ওপারে যেয়ে আমরা প্রথমে টাকাকে ভাঙিয়ে ভারতীয় মুদ্রা রুপি করে নিই। এরপর সিএনজি যোগে আমরা ভারতের বনগাঁ রেলস্টেশন যায়। বনগাঁ থেকে কলকাতার শিয়ালদহগামী ট্রেনে উঠি। বেলা ১২টার দিকে আমরা উত্তর চব্বিশ পরগনার হাবড়া থানার রেলস্টেশনে নেমে পড়ি। উজ্জলের দাদু-দিদার বাড়ি এই হাবড়াতেই। সেখানে আমাদের দুপুর ও রাতের খানাপিনা চলে। পরদিন ভোর ৬টার ট্রেনে চেপে আমরা আবার হাবড়া থেকেই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ট্রেনে যাতায়াত করে ভারতের মানুষ। এজন্য এসব লোকাল ট্রেনে থাকে মানুষজনের উপচে পড়া ভিড়। এছাড়া ভারতে ট্রেনে অনেক সস্তায় যাতয়াত করা যায়।

৯টার দিকে আমরা কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে যায়। কলকাতার রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্যাক্সিক্যাব ছাড়াও রয়েছে উবার, উলা এবং এসি ক্যাব। মানুষজন এসব ক্যাবে মিটার এবং মিটার ছাড়া চুক্তিতেও ভাড়া করতে পারে। এছাড়া কলকাতায় সবার আকর্ষণ থাকে ট্রামে চড়া। মেট্রোরেলও কম কিসে। কলকাতার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে চলছে সেই পুরাতন মডেলের বাস। আমাদের একটা সমস্যা দাঁড়িয়ে গেল আমারা আগে কী দেখবো সেটা নিয়ে। কারণ কলকাতার যেসব ঐতিহাসিক স্থপনা রয়েছে সেগুলো মাসব্যাপী ঘুরে দেখলেও শেষ হবে না। আমরা তিনদিনের ঘোরাঘুরির একটা শিডিউল তৈরি করলাম। ঠিক হলো প্রথম দিনে যাব কলকাতার সায়েন্স সিটিতে। এরপর একে একে ভিক্টোরিয়া পার্ক, ইডেন গার্ডেন, হাওড়া ব্রিজ, নিউমার্কেট,আকাশবাণী ভবন, হাইকোর্ট, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া দেখা শেষ করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বেজে গেল।

ঘুমানোর আগে পরদিন ঘুরাঘুরির জন্য ঠিক করি কলকাতার যাদুঘর, চিড়িয়াখানা, ময়দান, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, টালিগঞ্জ, কালীঘাট ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এয়ারপোর্ট। শেষের দিন রাখি শপিংয়ের জন্য। কলকাতায় কমদামে কেনাকাটার জন্য নিউমার্কেট ভালো। তাছাড়া কলকাতার সবচেয়ে বড় চেইন সুপারশপ হলো ‘বিগবাজার’। এখানে সমস্ত কিছু পাওয়া যায়। খাবার দাবারের দিক থেকে কলকাতা তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। যেমন ছোট মাটির কাপে চা খাওয়া, পাতার পাত্রে আলু পুরী খাওয়া, সব ধরনের কাচ্চি বা বিরিয়ানি রান্না হয় বাসমতি চাল দিয়ে। কলকাতার নিউমার্কেট এলাকাতে কিছু মুসলিম রেস্টুরেন্ট আছে যেখানে সস্তায় গরুর মাংস পাওয়া যায়।

কলকাতার কোনো রাস্তায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের মত দীর্ঘক্ষণ জ্যামে আটকে থাকতে হয়নি। যানবাহনগুলো চলছে একমুখী। সবগুলো মোড় বা সিগন্যাল পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ নেই, তারপরও গাড়ির চালকরা লালবাতি জ্বললেই গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছেন আবার সবুজ বাতি জ্বললেই গাড়ি চালাচ্ছেন। এই কয়েক দিনে কলকাতার কোথাও কোনো গাড়িকে উল্টা পথে চলতে দেখিনি। রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে রয়েছে সরকারিভাবে তৈরি করা পানি খাওয়ার জন্য বিশেষ সুব্যবস্থার ট্যাপ। কলকাতার প্রত্যেক ট্রেন স্টেশনেও রয়েছে এই পানি খাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা।

কলকাতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আগে ভাগে তেমন জানাশোনা না থাকলে ভোগান্তি পোহাতে হয়। যদি বুঝতে পারে বাংলাদেশি তখন বেশি পরিমাণে দাম চায়, সেটা হোটেলের রুম বা ট্যাক্সি ভাড়া হোক কিংবা বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম হোক। অনেক সময় কোনো জায়গার নাম জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিতে চায় না। অনেকে ভালো হোটেল চিনিয়ে দেয়ার নাম করে ঠকানোর চেষ্টা করে।

ঘোরাঘুরি শেষে যথারীতি আবার কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে বনগাঁ স্টেশন আসলাম। এরপর ভারতীয় চেকপোস্ট ক্রস করে বাংলাদেশের মাটিতে বেনাপোলে প্রবেশ করলাম। সেখান থেকে সরাসরি বাস যোগে খুলনায় ফিরে যার যার বাসাতে পৌঁছালাম। প্রথম বিদেশ সফরে এই কয়েকদিনে যে ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে সেটা ভবিষ্যতের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে তা বলাই যায়।

লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/একিউএফ

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত