artk
৫ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রোববার ২০ আগস্ট ২০১৭, ১১:১২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

প্রাণ এগ্রো কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে হুমকির মুখে আবাদি ফসল

মাহবুব হোসেন, নাটোর প্রতিনিধি | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৯৩৩ ঘণ্টা, বুধবার ১৯ জুলাই ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১২২৮ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ২০ জুলাই ২০১৭


প্রাণ এগ্রো কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে হুমকির মুখে আবাদি ফসল - বিশেষ সংবাদ

নাটোরে প্রাণ এগ্রো কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে নষ্ট হচ্ছে জমির ফসল। হুমকির মুখে রয়েছে দেড় থেকে দুই হাজার বিঘা জমির ধানসহ বিভিন্ন ফসল। এমনকি বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানির সাথে মিশে ছড়িয়ে পড়েছে দুটি বিলে। এতে মরে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ।

ভুক্তভোগীরা জানান, ১০ থেকে ১২ দিন আগে প্রাণ এগ্রো কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানির সাথে মিশে সদর উপজেলার আয়চান্দের বিল এবং চানপুর বিলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দু’একদিনের মধ্যে রোপা-আমন ধান পচে নষ্ট হওয়া শুরু হয়। এছাড়া কারখানার আশপাশের আখসহ অন্যান্যে সবজি ক্ষেতেও মরক দেখা দেয়। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

এই নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা প্রতিবাদ করলে প্রাণ এগ্রো কারখানার ডিজিএম হয়রত আলীসহ অন্যরা এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় কৃষকদের ক্ষতি তারা চোখে দেখে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে জানান ক্ষতিগ্রস্তরা।

এদিকে, বিষাক্ত বর্জ্য মুক্ত জলাশয়ের পানি সাথে মিশে যাওয়ার কারণে আশপাশের পুকরে ঢুকে পড়েছে পানি। এতে মরক দেখা দিয়েছে পুকুরের মাছের। এছাড়া মুক্তজলাশয়ের মাছও মারা যাচ্ছে। সব মিলে দুষিত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিষাক্ত বর্জ্য পানির সাথে মিশে কাল রঙ ধারণ করেছে। কতগুলো স্থানে বর্জ্যের স্তুপ পড়ে রয়েছে। রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কেউ পানিতে নামতে চান না। এর আগেও প্রাণের বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে কৃষকদের। সে সময় বুঝতে না পারলেও আবারও একই ধরনের ঘটনায় দিশেহারা তারা।

এ নিয়ে কথা হয় চানপুর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নূরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “প্রতি বছরই প্রাণ তাদের কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মিশানো পানি খোলা মাঠে ছেড়ে দেয়। এতে কারখানার আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। এই বছর তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আখ রোপন করেন। কিন্তু প্রাণ কোম্পানির বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে তার আখে মরক দেখা দিয়েছে।”

কথা হয় আরেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুস সামাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, “তার আড়াই বিঘা জমিতে এবার রোপা-আমন ধান রোপন করেন। কিন্তু বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে তার পুরো জমির ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।”

শুধু আব্দুস সমাদ নয়, একই এলাকার কৃষক সুমন হোসেনের দুই বিঘা, শাহজাহান আলীর ৪বিঘা, সামছুল হকের দুই বিঘা, আব্দুল হাকিমের দেড় বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে একই কারণে।

তবে ধানের পাশাপাশি সব চেয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছের। বর্তমানে মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ডিমসহ মরে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির সব মাছ। এছাড়া বিল সংলগ্ন কিছু কিছু পুকুরে বিষাক্ত পানি প্রবেশ করার কারণে পুকুরের মাছেও মরক দেখা দিয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মাছ চাষিরা।

স্থানীয় আব্দুল হালিম বলেন, “বিলে কারখানার বিষাক্ত পানি প্রবেশ করার কারণে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ মরে যাচ্ছে। যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে তারা সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন।”

হেলাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, “প্রাণ কোম্পানি মেডিক্যাল কলেজ তৈরী করার নামে করে তাদের কাছ থেকে জমি ক্রয় করে। কিন্তু এখন কলেজের নাম করে তারা কারখানা তৈরী করছে। আর বিষাক্ত বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ছেড়ে দিয়ে কৃষকদের ক্ষতি করছে।”

কারাখানার বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানির সাথে মিশে ছড়িয়ে পড়ে এলাকায় ক্ষতির কথা স্বীকার করলেন কারখানার কর্মকর্তারাও। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান তারা।

প্রাণ এগ্রো কারখানা পাল-২ এর এডমিন ইন চার্জ রেজাউল করিম রেজা বলেন, “ড্যাম্পিং করার বর্জ্য কারখানার ভিতরে চৌবাচ্চা করে সেখানে ফেলা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে চৌবাচ্চা ভরে পার্শ্ববর্তী বিলের পানিতে মিশে গেছে। এতে ধানসহ অন্যান্য ফসলের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। কোম্পানির ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আগামী দিনে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”

বিষয়টি নিয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “প্রাণ এগ্রো কারখানায় তাদের এটিটিপি থাকলেও খরচ কমানোর জন্য ইটিটিপি চালু রাখে না। তাদের কারখানার নিয়মিত বর্জ্য তারা নারদসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়। সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে সেটা নজরে এসেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ইটিটিপির মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “প্রাণ এগ্রো কারখানা তাদের নতুন পাল-২ ড্যাম্পিং এর র্বজ্য শোধন না করেই গর্ত করে সেখানে ফেলছে। এতে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। প্রাণ কারখানাকে প্রাথমিকভাবে আমার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে তাদের সতর্ক করে দেয়া হবে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তারা বর্জ্য শোধনে ব্যবস্থা না নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

নিউজবাংলাদেশ.কম/এএইচকে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত