artk
৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭, ২:১৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

স্বর্ণপদক জয়ী সাগরের ফাইটার হয়ে উঠার গল্প

ময়মনসিংহ থেকে উবায়দুল হক, রাকিবুল ইসলাম | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৯০৩ ঘণ্টা, সোমবার ১৭ এপ্রিল ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২১২৭ ঘণ্টা, সোমবার ১৭ এপ্রিল ২০১৭


স্বর্ণপদক জয়ী সাগরের ফাইটার হয়ে উঠার গল্প - ফিচার

প্রায় ১৩ বছর আগের কথা। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। টিভিতে চিত্রনায়ক রুবেল অভিনীত ‘লড়াকু’ সিনেমা দেখে মার্শাল আর্ট শেখার প্রচণ্ড আগ্রহ জাগে। কিন্তু এলাকায় কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল না। তাই দেশি-বিদেশি প্রচুর সিনেমা দেখে বাসায় একা একা মার্শাল আর্টের বিভিন্ন কৌশল অনুশীলন করতে থাকি। এরপর নিয়মিত শরীরচর্চা ও অনুশীলন করে গত ৮/৯ বছরে মার্শাল আর্টের বিভিন্ন কলাকৌশল রপ্ত করি। এরই মাঝে ফেসবুকে পরিচয় হয় সাউথ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক বিজয়ী ফাইটার ও বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের (মার্শাল আর্ট সংগঠন) জাতীয় কোচ মেজবাহ উদ্দিনের স্যারের সঙ্গে। এরপর ভর্তি হই স্যারের ‘শাউলিন উশু ফাইটার’ স্কুলে। কিন্তু পড়াশোনার চাপে একদিনের বেশি ক্লাস করতে পারিনি। গত বছর মেজবাহ স্যার আমাকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় মিক্সড মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে বলে। স্যারের অনুপ্রেরণায় কোনো প্রকার অনুশীলন ছাড়াই আমি সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পেশাদার ফাইটারদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে স্বর্ণপদক জিতে নেই।

নিজের মার্শাল আর্ট ফাইটার হওয়ার গল্পটা এভাবেই নিউজবাংলাদেশের এই প্রতিবেদকের কাছে তোলে ধরেন জীবন হোসেন সাগর (২৩)। সাগরের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আছিম ইউনিয়নের লাঙ্গল শিমুল গ্রামে। বাবা হাবিব উল্লাহ বাহার পেশায় একজন পল্লী চিকিৎসক, মা রমিসা খাতুন গৃহিণী। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সাগর দ্বিতীয়। ঢাকার তিতুমীর সরকারি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাগর পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করছেন একটি বেসরকারি সংস্থায়।

সাগর বলেন, “এবারের মিক্সড মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের ফাইটাররা অংশগ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছে। চলতি এপ্রিল মাসে শুরু হওয়ার কথা এই আসর। এবার বিদেশিদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে চাই। এছাড়াও এ মাসেই প্রতিবেশি দেশ ভারতে একটি আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগিতার আসরে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি।”

তবে ব্যক্তিগত কোচ না থাকার পাশাপাশি পড়াশোনা ও চাকরির কারণে ঠিকমতো অনুশীলন করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সাগর।

বাংলাদেশ মিক্সড মার্শাল আর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ চৌধুরী সাগরের বিষয়ে নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আমাদের সংগঠনটির আর্থিক সংকট আছে, তবে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা বিশ্বমানের ফাইটার তৈরি করতে পারবো।”

“এপ্রিলেই সাগরসহ ৫ জন জাতীয় মার্শাল আর্টিস্ট ভারত যাচ্ছে যাচ্ছে ‘আর্ন্তজাতিক ইউএফআই মার্শাল আর্ট চ্যাম্পিয়নশিপ’ প্রতিযোগিতার আসরে অংশগ্রহণ করতে। আশা করছি, বিদেশি ফাইটারদের হারিয়ে ওরা দেশের জন্য ভালো সুনাম বয়ে আনবে।”

মার্শাল আর্টের দক্ষতা ছাড়াও সাগরের মধ্যে আছে অবিশ্বাস্য কিছু দক্ষতা। তিনি নিজের মাথায় চাপ দিয়ে লোহার রড নিমেষেই বাঁকা করতে পারেন। লাঠি দিয়ে পিঠে পেটানো হলেও কোনো ধরনের ব্যথা অনুভব করেন না। পেটে পুরো শক্তি দিয়ে অনবরবত ঘুষি মারতে থাকলেও তিনি থাকছেন স্বাভাবিক। ধারালো বস্তু কিংবা সুঁচ তার বাহু বা মাংসপেশিতে ঢুকিয়ে দিলেও সে স্থান থেকে কোনো রক্তপাত হয় না বা কোনো ব্যথাও অনুভূত হয় না!

এমন আরো অনেক অবিশ্বাস্য দক্ষতার কারণে জীবন হোসেন সাগরকে ‘সুপার হিউম্যান’ হিসেবে কাছের মানুষরা অন্যদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।

কথা হয় সাগরের বন্ধু উবায়দুল হক, সুজন, টিটু, মুরাদ, গালিব, ইমরান, রিয়াদের সঙ্গে। নিউজবাংলাদেশকে তারা বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা সাগরের ক্ষমতা দেখে আসছি। স্কুলে থাকতে ৬ জন বন্ধু মিলে তার পেটের ওপর দাঁড়াতাম, পেটে সবাই মিলে সজোরো ঘুষি দিতাম কিন্তু তাতে সে থাকতো স্বাভাবিক। আর যখন সে আমাদের দেখিয়ে তার হাতের মাংশপেশিতে সুঁচ ঢুকাতো তখন রীতিমতো অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভয়ও পেতাম। তখন থেকেই মূলত সে আমাদের কাছে একজন ‘সুপার হিউম্যান’। কিন্তু প্রচার-প্রচারণা না থাকায় তার সাগরের বিষয়টি দেশবাসীর কাছে এখনো অজানা।

নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে সাগর নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আমার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। শেষ কবে ওষুধ খেয়েছিলাম, তাও মনে নেই। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সারা শরীরে সমানভাবে শক্তি উৎপন্ন করতে পারি।” তিনি আরো বলেন, “একজন আন্তর্জাতিক মানের ফাইটার হওয়ার পাশাপাশি আমি বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশেও একজন ‘সুপার হিউম্যান’ আছে।”

সাগরের ব্যাপারে বাংলাদেশ উশু অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কোচ মেজবাহ উদ্দিন নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “সাগর দেশের একটি বিরল প্রতিভা। সে শুধু একজন দক্ষ ফাইটার না একজন ‘সুপার হিউম্যান’। আমার বিশ্বাস, নিয়মিত চর্চা ও উন্নত প্রশিক্ষণ পেলে সাগর আন্তর্জাতিক মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতার আসরগুলোতে অংশগ্রহণ করে দেশের সুনাম বয়ে আনতে পারবে।”

সাগরের বাবা হাবিব উল্লাহ বাহার নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “ছোট বেলা থেকেই ভয়ানক শারীরিক কলা কৌশল রপ্ত করার কারণে সাগরকে এলাকায় সবাই সুপারহিউম্যান বলে ডাকতো। কিন্তু পড়াশোনা ও শারীরিক ক্ষতি হবে ভেবে আমি তাকে এসব থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দমাতে পারিনি।”

জীবন হোসেন সাগর মার্শাল আর্টে স্বর্ণপদক জিতে এলাকার সুনাম বাড়িয়েছে। এখন বড় ফাইটার হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে, তার কাছে এটাই প্রত্যাশা সবার।

নিউজবাংলাদেশ.কম/ওএইচ/আরআইআর/এসডি

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত