artk
৮ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসব

মুনির আহমদ | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১১৩৫ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২০০৫ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ০২ মে ২০১৭


পহেলা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসব - অসম্পাদিত

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা ১৪২৪ সনের প্রথম দিন। বাঙালির নববর্ষ বলে কথা। সারাদেশ তাই বৈশাখী উৎসবে মাতোয়ারা। ষোলআনা বাঙালির চিরচেনা রঙে, ঢঙে, রূপে ও বৈচিত্রে। নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবয়বে। পহেলা বৈশাখের উৎসব মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। প্রতিটি বাঙালি উৎসবটি পালন করে হৃদয়ের গভীর থেকে। আনন্দ উল্লাসের সঙ্গে। বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করে। এই দিনে বাঙালি ফিরে পায় রঙে রঙে রঙিন হওয়ার তুলনাহীন এক অনুভূতি যা সুরের ঝংকারের মত, ছন্দের উত্তেজনার মতো, শিল্পীর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় ক্যানভাসে ফুটে ওঠা দৃষ্টি নন্দন ও স্বপ্নময় অপরূপ তৈলচিত্রের সৌন্দর্যের মতো। 

পহেলা বৈশাখের উৎসবটি বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্ব সম্পদ। চিরন্তন এই মহোৎসব উদযাপিত হয় জাতীয়ভাবে। বছরের পর বছর জুড়ে, ঘুরে ফিরে বার বার আসে, বাঙালির প্রতিটি আঙিনায় প্রাণের উচ্ছ্বাস নিয়ে। অনিন্দ্য সুন্দর রূপ বৈচিত্র নিয়ে। বিগত বছরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হতাশা আর ক্লান্তির সব হিসাব চুকে আগামীর দিকে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রবল ইচ্ছা শক্তি নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে, শহর-বন্দরে ইটপাথরের কোলাহলে, রমনার বটমূলে, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা আর ব্যবসায়ীর হালখাতায়, মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত সেই ষাঁড়ের লড়াই কিংবা চট্টগ্রামে জব্বারের বলিখেলার ময়দানে, পাহাড়ীদের বিজু উৎসবে সাদা শাড়ি লাল পাড়ে, রঙ-বেরঙের সাজ পোশাকে, গ্রামীণ সংস্কৃতির বিভিন্ন অভিব্যক্তি তথা নৃত্যগীতের সঙ্গে পান্তা ইলিশ ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের সমারোহ নিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ মেতে ওঠে চিরায়ত এই উৎসবের দিনে। উৎসবটি তাই সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক। 

বাঙালিয়ানার এই দিনে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ এক পংক্তিতে দাঁড়িয়ে একাত্মতা অনুভব করে। বিভেদ হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সব সন্দেহ ও অবিশ্বাসের গ্লানি মুছে অগ্নিস্নানে শুচি হয় ধরা। সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে তুলে, সব সংস্কারের জাল ছিন্ন করে, সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করে পহেলা বৈশাখ সবাইকে কাছে টানে। ঠেলে দেয় পারস্পরিক সহ-অবস্থানে। সমাজব্যাপী সৃষ্টি করে ঐক্যানুভূতি। বাঙালি জাতিসত্তার জীবন বৈচিত্রের বহুমুখী ধারাকে সমবেত করে মহামিলনের বিস্তীর্ণ মোহনায়। এভাবেই পহেলা বৈশাখ জাতীয় জীবনের প্রতিটি বাঁকে রূপান্তরিত হয়েছে মিলনতিথি রূপে। 

বাংলা বর্ষের জন্ম হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। খাজনা আদয়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষে তিনি এই সনের প্রবর্তণ করেন। তার নির্দেশে রাজদরবারের জ্যোতিষী ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী সৌরসাল ও চন্দ্রসালের মধ্যে সমন্বয় করে নতুন সন বা বাংলা সালের উদ্ভাবন করেন। সেই থেকে বাংলা সন হয়ে যায় বাঙালির। জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে। বাংলা বারো মাস ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করে ঋতু বৈচিত্রের সব লীলা খেলা। গ্রামীণ জীবনে ফিরে আসে সজীবতা। বাংলা সনের গণনা শুরু হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে। গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলি সন নামে পরিচিতি পেলেও  পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামেই সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

আকবরের শাসনামলে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল প্রকার খাজনা পরিশোধ করতে হতো। পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। উৎসবটি পরিণত হতো সামাজিক অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষের মধ্যে তৈরি করতো সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন। তখনকার সময় বাংলা বর্ষের প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হালখাতা। যার অর্থ নতুন হিসাব বই খোলা। ব্যবসায়ীরা যার যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া হিসেবে পুরাতন বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই চালু করতো। ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব নিকাশ সংরক্ষণ করা হলেও গ্রাম বাংলার দোকানিরা বিশেষত স্বর্ণের দোকানিরা আজও পুরাতন বছরের হিসাব হালনাগাদ করে হালখাতার মাধ্যমে। প্রথাগত নিয়মানুযায়ী এখনও দোকানিরা হালখাতার দিনে ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা। ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলে। ঢাকায় বাংলা নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৯৬৭ সালে, রমনার বটমূলে, ছায়ানটের উদ্যোগে। ছায়ানটের সাংস্কৃতিক কর্মীরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক শাসন, নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে নিজস্ব সংস্কৃতির অপরূপ ভঙ্গিমা তুলে ধরে গানে গানে মুখরিত কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। তখন থেকেই রমনার বটমূল ঘিরে সূচিত হয়ে আসছে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যতসব আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই রমনার বটমূল ধর্মীয় পরিচয়ের সামান্যতম প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে স্বজাতির সবাইকে একসূত্রে গেঁথে জড়ো করে নিয়েছে তার সুশীতল ছায়াতলে, পরম প্রশান্তি ভরা স্বস্তিতে। 

মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত করে নান্দনিকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগ ও নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে এর সব আনুষ্ঠানিকতা। ১৯৮৯ সাল থেকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির ধ্বংস কামনা নিয়ে শুরু হওয়া এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগটি এখন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উদযাপনের যেমন অন্যতম অনুষঙ্গ তেমনি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশেষত্ব হলো তা মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন প্রতিষ্ঠায় যেমন সহায়ক তেমনি যুক্ত করে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার ভিন্ন এক আহ্বান। শান্তির বিজয় ও অপশাসনের ধ্বংস নিয়ে সে আবির্ভূত হয় ধরায়। 

কোনো কোনো মহল থেকে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালাকে অনৈসলামিক বলে চিহ্নিত করা হয়। তারা বলে থাকেন, বাংলা নববর্ষ পালন অনুষ্ঠান হিন্দুদের সংস্কৃতি। তাদের ধারণাটা ভ্রান্তই নয় বরং উদ্দেশ্যমূলকও বটে। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান পালন হিন্দু বা মুসলিম বা কোনো জাতি গোষ্ঠীর একার নয়। এই উৎসব সার্বজনীন। বাংলা ভাষাভাষি সব জাতি গোষ্ঠীর, সব সম্প্রদায়ের, সকল শ্রেণী পেশার ও ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সব মানুষের। তাই যুগের পর যুগ পেরিয়ে নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠান ‘পহেলা বৈশাখ’ আজও রয়ে গেছে অসাম্প্রদায়িক। এই দিন বাঙালি আপনা থেকেই আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। ফিরে পায় তার শিকড়ের ঠিকানা। সব সম্প্রদায়ের, সব ধর্মের, সব চেতনার মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করে। উপনীত হয় মহামিলনের বিস্তীর্ণ মোহনায়, ঐক্যের আঙ্গিনায়। সার্বজনীনতার বদৌলতে উৎসব অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে মহা আনন্দের ও পরমতৃপ্তি ভরা প্রশান্তির।

মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুছে যাক সব জরাজীর্ণতা। দূর হোক সব জঞ্জাল। জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা। চিরন্তন ও অবিকৃত থাকুক পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠানের সার্বজনীনতা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারা। হোক জাতীয় ঐক্যের প্রতীকস্বরূপ এক আনন্দঘন মহোৎসব। বাংলাদেশ হোক শান্তি এক মহা নীড়। আনন্দলোকে মঙ্গালোকে বিরাজ করুক সত্য ও সুন্দর।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইউডা

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত