artk
১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

বৈশাখের হারিয়ে যাওয়া সেইসব স্মৃতি

ফাওজুল কবির | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১০৩০ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ০৮৫৪ ঘণ্টা, শনিবার ১৫ এপ্রিল ২০১৭


বৈশাখের হারিয়ে যাওয়া সেইসব স্মৃতি - অসম্পাদিত
ফাওজুল কবির (ফাইল ফটো)

মধুর শৈশব ও কৈশোরকে ইতোমধ্যেই হারিয়েছি। এখন যৌবনকাল। জীবনের মধ্য গগন। এ জীবন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে অল্পতেই বিস্মিত হওয়ার অপার আনন্দকে; কেড়ে নিয়েছে বৈশাখের দুরন্তপনা। আসলে আমার জন্ম এক নিভৃত পল্লীতে, বৈশাখের আড়ম্বরতা সেখানে কোনওকালেই পৌঁছাইনি। সেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন ছিল না কখনোই। বৈশাখি মেলাও চর্মচক্ষে উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের জীবনেও বৈশাখের আলাদা একটা ছোঁয়া ছিল, তার আগমনের আনন্দময় বার্তা ছিল।

এখন টাইম মেশিনে চড়ে পেছনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। সাধ জাগে বৈশাখী ঝড়ে বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে আম কুড়াতে। তাছাড়া সূর্য্যি মামার প্রকট তাপে পুড়ে হাঁটুজল নদীতে লাফ দেওয়ার স্মৃতিও কখনো সখনো নস্টালজিক করে তোলে। মনে পড়ে দুপুরের খাওয়ার পর লুকিয়ে বাইরে পালিয়ে যাওয়ার কথা; ঘামভেজা শরীরে গমক্ষেতে লুকিয়ে ১০ পয়সার হরিণ বিড়ি খাওয়ার অনুচিত কাণ্ডকেও। মনে পড়ে ভাঙনশীল নদীর পাড়ে ফুটবল খেলার কথা।

এই বৈশাখেই একবার বাবার হাতে বেদম মার খেয়েছিলাম। অবশ্য একটা গুরুতর অপরাধও ছিল। অন্যের ক্ষেত থেকে তরমুজ চুরি করেছিলাম। বাবার দেয়া নির্মম ওই শাস্তির পরেও আমি একবারেই দমে যাইনি। বরং চুরিতে হাত পাকিয়েছিলাম। অন্যের জমি থেকে গমের আঁটি চুরি করে আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া, লিচু কিংবা আম চুরিতে বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করেছিলাম। তাছাড়া বৈশাখের পড়ন্ত বিকেলে পাড়ার ছেলে-মেয়েরা মিলে দাড়িয়াবান্ধা খেলতাম। খোলা জায়গায় লম্বালম্বিভাবে অনেকগুলো ঘর দেগে ওই খেলাটা খেলতে হতো। এরপর সন্ধ্যার পর চড়ুঁইভাতি। রাতে সম্বিলিতভাবে লুকোচুরি খেলা।

তবে আমাদের বৈশাখ স্মৃতিচারণায় সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হালখাতা খাওয়া। ৯০ পরবর্তী সময়। গ্রমীণ জীবনে তখনো সেভাবে টিভির চল হয়নি। কয়েক পাড়া খুঁজে হয়তো দু-একটা টিভি পাওয়া যেত। স্বাভাবিকভাবে আমাদের বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত। এই অবস্থায় হালখাতা আমাদের শিশুবেলার অন্যতম একটি মজার অভিজ্ঞতা ছিল, একই সঙ্গে উৎসবও। যদিও আমার বাবা কিংবা অন্যান্য কৃষিজীবী মানুষের জন্য হালখাতা ছিল বড় একটা দুশ্চিন্তার নাম। কেননা হালখাতার দিনে পুরনো হিসাব চুকিয়ে ফেলতে হতো। ব্যবসায়ীদের পুরনো পাওনা মিটিয়ে ফেলতে হতো। তাই টানাটানি করে সংসার চালানো কৃষক পরিবারের জন্য হালখাতা কখনো সামাজিক চাপ হিসেবে আর্বিভূত হত। যদিও লোকাচারকে মান্য করতে হালখাতায় অংশগ্রহণে একপ্রকার অলিখিত বাধ্যবাধকতা ছিল।

পরিষ্কার মনে আছে, একটু বড় হওয়ার পর প্রত্যেক বৈশাখে বাবা আমাকে ও আমার কয়েকজন চাচাত ভাইকে এক টাকা করে দিতেন। ওই স্মৃতি ভুলবার নয়, দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকতাম আমরা। কেননা তখন আমাদের কাছে এক টাকা মানে ছিল স্বর্গ খুঁজে পাওয়া। ওই এক টাকা দিয়েই যে অন্তত দশটি লজেন্স পাওয়া যেত। কিংবা সাধারণ মানের চারটি আইসক্রিম, অথবা নারকেল মিশ্রিত বিশেষ দুটি আইসক্রিম। সুতরাং ওই এক টাকা ছিল আমাদের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো মহাআনন্দের। এরপর অনেকটা সময় গত হয়েছে। বিশাল যমুনায় ব্রিজ হয়েছে, প্রমত্তা পদ্মাতে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলায় রাজাকারদের ফাঁসি হয়েছে ও হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশনেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে উন্নয়নের মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ের বিয়োজনে পুরনো ওই বৈশাখকে হারিয়ে ফেলেছি আমি। নিষ্ঠুর বয়স ও তার লব্ধ অভিজ্ঞতা ভালোলাগা ও ভালোবাসার ইন্দ্রিয়কে অনেকটা পিষে দিয়েছে। তবে ভিন্ন রূপে হলেও এখনো বৈশাখ উদযাপনের রীতি ভুলিনি। চৈত্র সংক্রান্তির রাত থেকেই বৈশাখকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হই।

লেখক: সংবাদকর্মী

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য