artk
৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

শৈশবের বৈশাখ
মায়ের দেয়া টাকা মেলায় গিয়ে দ্বিগুণ

মাহমুদুন্নবী চঞ্চল | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ০৯৪৫ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৩৫০ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭


মায়ের দেয়া টাকা মেলায় গিয়ে দ্বিগুণ - অসম্পাদিত
মাহমুদুন্নবী চঞ্চল (ফাইল ফটো)

‘মা এবার মেলায় যাব’– কথাটি শুনে খুব একটা পাত্তা দিল না মা। কিছুটা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘মেলায় যাওয়ার দরকার নাই। অনেক গ্যাঞ্জাম হয়। আর মেলাও বসে অনেকদূর। সুতরাং যাওয়া যাবে না।’

তারপরও ঘ্যানঘ্যান করতে লাগলাম। মা কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। ভাবলাম, মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। তারপরও শঙ্কা ছিল যথেষ্ট, কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র আমি নই।

তখনকার মেলা মানেই গ্যাঞ্জাম, হুড়াহুড়ি আর মারামারি। গ্যাঞ্জাম ছাড়া মেলা হয়েছে, এমনটি পাওয়া দুষ্কর। তখন আমি ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়ি। সময়টা ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে হবে হয়তো।

এখনকার মতো জাঁকালো পহেলা বৈশাখ তখন ছিল না। গ্রামের প্রেক্ষাপটে তা ছিল সামান্যই। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ছোট পরিসরে বসত একদিনের মেলা, তাও দুপুরের পরে। মাইল দেড়েক দূরে নাখারাজ ও বাঘুলপুর গ্রামে বসত মেলা।  গ্রাম্যের ভাষায় সেই মেলাকে আমরা বলতাম, আড়ং। কেন মেলার নাম আড়ং, জানা ছিল না তখন। এখন বুঝি মেলার সমার্থকই আড়ং।

চৈত্র মাস এলেই আড়ংয়ের যাওয়ার প্রস্তুতি দেখা যেত। সাজসাজ রব পড়ে যেত কুমারদের বাড়িতে। ব্যস্ততা বেড়ে যেত বহুগুণ। মাটির নানা জিনিস তৈরিতে কূল পেত না তারা। স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঝে মধ্যে আমরা তাদের মাটির জিনিস বানানো দেখতাম মুগ্ধ চোখে। কিভাবে মাটি দিয়ে কত জিনিস তৈরি হতো।

চৈত্রের কাঠফাটা রোদেও তখন সময়টা ভালো যেত এক অর্থে। সারাক্ষণই মনের মধ্যে ঘুরপাক খেত, কবে আড়ং আসবে। মাঝে মধ্যেই মাকে জিজ্ঞাসা করতাম, আজ চৈত্র মাসের কত তারিখ। মা বিরক্ত হতেন, ‘তোর কী হবে তা জেনে। ‘ বলতাম, ‘বলোই না।’ মা বলত, কোন এক তারিখের কথা। আমি দিন গুনতাম। মাও ঠিক বুঝতো, কী ভাবছি আমি মনে মনে।

মনে আছে আড়ং আসন্ন। আমি পিড়াপিড়ি করছি মাকে ঘিড়ে, আড়ংয়ে কিন্তু যাবই। টাকা দিও। কিন্তু মার একটাই কথা, আড়ংয়ে মারামারি হয়, সেখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। তিনি উদাহরণ টেনে বললো, ‘দেখ তোর নবাব কাকা নাখারাজ আড়ংয়ে গিয়ে মারামারির মধ্যে পড়েছিল। সেও মার খেয়েছে, আবার দিয়েছেও। কিন্তু ঐ এলাকাতেই এখন সে যেতে পারে না। বুজছিস কিছু?’

আমি বলি, তাহলে বাঘুলপুরের আড়ংয়ে যাব। ওখানে তেমন ঝামেলা হয় না। মা বুঝতে পারল আমি যাবই। ফলে আর কিছুই বলল না।

প্রতীক্ষিত আড়ংয়ের দিন হাজির। দুপুরে গোসল করে আমি রেডি। মাকে বললাম, টাকা দাও। মা, সাত টাকা দিল। আমি বললাম, দশ টাকা পুরাইয়া দাও। মা বললেন, আর নাই। সঙ্গে শর্ত যোগ করলেন, সঙ্গে ছোট ভাই শান্তকেও নিয়ে যেতে হবে। সাবধানে থাকতে হবে। ভিড়ের মধ্যে যাওয়া যাবে না। বিপদ এলে নিরাপদ জায়গায় যেতে হবে… ইত্যাদি।

বাঘুলপুর আমাদের রানীনগর গ্রামের ঠিক অপজিট, পূর্ব দিকে। দুটি গ্রাম, মাঝে ধু ধু ফাঁকা মাঠ। সেই মাঠ দিয়ে দুই ভাই রওনা দিলাম। মা আমগাছের নিচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। যতদূর কথা কানে আসে, মায়ের উপদেশ চলল।

মাইল দেড়েকের পথ। হেঁটেই যেতে হবে। তাতে অবশ্য ক্লান্তি আসছে না মোটেও। বরং দারুণ উত্তেজনা। কী কী কিনব, তার লিস্ট হচ্ছে মনে মনে। ছোট ভাই শান্ত তখন ওয়ান কি টুয়ে পড়ে। সেও জোর কদমে এগুচ্ছে আমার সঙ্গে।

আড়ংয়ের কাছাকাছি আসতেই ভিন্ন উত্তেজনা। নানারকম বাশির সুর, ঢোল, বাজনা, মানুষের কথার শব্দ মিলিয়ে রোমাঞ্চকর পরিবেশ। মনে আছে বাঘুলপুরের সেই আড়ং হতো একটি মন্দিরের সামনে। প্রথমে সেখানেই গিয়ে দেখলাম মন্দিরের সাজ সজ্জা।

আমার ডান হাতে শান্তর হাত জোর করে আটা। ভীড়ের মধ্যে যাতে না ছুটে যায়। প্রথম দিকে কিছুই কিনলাম না। ঘুড়ে ঘুড়ে দেখার পালা। তারপর শুরু হলো কেনা কাটা। সাত টাকা নেহায়েত কম ছিল না সেই সময়ে, তারপরও আমাদের আকাঙ্খা মেটাতে পারেনি। হিসাব করেই খরচ করতে হয়েছে।

ইলিশ কিংবা আমের মাটির ব্যাংক। কয়েক পদের খেলনা। তেষ্টা পেলে ফালি করা তরমুজ। গরম গরম জিলাপি। এসব কিনতেই হঠাৎ দেখি ৫ টাকা শেষ। আছে মাত্র দুই টাকা। শান্তকে বললাম, ভাই চল বাড়ি যাই। মোটামুটি সবই কিনেছি, কী বলিস। শান্ত মাথা নাড়ল।

হঠাৎ জুয়ার আসরে চোখ আটকালো। কৌতুহল বশেই দেখতে লাগলাম। কেউ হারছে, কেউ জিতছে। আমি ভাবলাম, দুই টাকা আছে, ধরে দেই কোন কোর্টে। ভাগ্য ভালো হলে পাব, না পেলেও ক্ষতি নেই। আমাদের আড়ং তো শেষ। তো আল্লাহর নাম করে অনেকটা ভয়ে ভয়ে একটি কোর্টে রাখলাম দুই টাকা।

জুয়াড়িরা ছক্কা পাঞ্জার বড় গুটি বড় কৌটার মধ্যে নাড়তে লাগল। আমি তো ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করছি। বুকের মধ্যে ধুকধুক করছে। চাল দেয়ার পর বুঝিনি কিছু। সব কোর্টের টাকা তারা একপাশে জড়ো করল, আমার কোর্টে দুই টাকা পড়েই আছে। ভাবলাম, সবাই পাইছে আমিই হারাইলাম বুঝি।

কিন্তু না, ওই দুই টাকার সঙ্গে আরও পাঁচ টাকা, মোট সাত টাকা হাতে করে জুয়াড়ি বলল, এই টাকা কার, নেন? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কাঁপা কাঁপা হাতে টাকাগুলো নিয়েই দ্রুত স্থান ত্যাগ করি, পাছে যদি কিছু হয়।

জুয়ায় জিতে আমি তো বাকরুদ্ধ। শান্তও ব্যাপক খুশি। আবার আমাদের কাছে সাত টাকা, কী আশ্চর্য। আবার শুরু হলো নতুন উদ্যেমে কেনা কেটা। সে এক ভিন্ন অনুভূতি। যা আসলে বোঝানোর মতো নয়।

নতুন করে কেনাকাটার সময় ঘটল বিপদ। আড়ংয়ে লেগে গেল হুড় (গ্রামের ভাষায় হুড়, যা আসলে ইচ্ছাকৃত গ্যাঞ্জাম)। হুড়ের বিশেষত্ব হলো, একদল ছেলে ইচ্ছা করেই আড়ংয়ে গ্যাঞ্জাম পাকিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। তা দেখা দেখি সবাই পালাতে শুরু করে। এর মধ্যে সুযোগ সন্ধানীরা লুটে নেয় জিনিসপত্র।

হুড়ের সময় আমি শান্তকে নিয়ে মন্দিরের কাছাকাছি নিরাপদ অবস্থানে। দেখছিলাম কে কেমন করে। কেউ পুতুলের কার্টন নিয়ে পালাচ্ছে, কেউ বাঁশি-খেলনার ঝোলা, কেউ বা রসগোল্লা-জিলেপির পাতিল নিয়ে দৌড়। রসগোল্লা খাচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। দোকানিরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে জিনিসপাতি রক্ষা করতে, কিন্তু পারছে আর কই।

হঠাৎ করে লাগা হুড় হঠাৎ করেই থেমে গেল। মায়ের কথা মনে পড়তেই শান্তকে বললাম, চল বাড়ি যাই। আর এখানে এক মুহূর্ত নয়। কিছু মিষ্টি জাতীয় জিনিস কিনে রওনা দিলাম বাড়ির পথে।

পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে সূর্য। বাঘুলপুর গ্রাম ছেড়ে ফাঁকা জায়গায় এসে পড়েছি। দ্রুত পা চালাচ্ছি। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। আমাদের সঙ্গে অনেকেই যাচ্ছে। নানা রকম কথাবার্তা। কে কী কিনল? মেলা কেমন হলো। সিনিয়র কেউবা আমাদের দেখে বলতে লাগল, ‘পোলাপানের সাহস কত, আড়ংয়ে আসে। যে হুড় লেগেছিল আজ, পায়ের নিচে পড়লে তো ভর্তা হয়ে যেত।’

আমরা হেঁটেই যাই। মনে বেশ আনন্দ। কত কিছুই তো কিনলাম। বিড় বিড় করে কথা বলি শান্তর সঙ্গে। ওর ছোট্ট মুখটিতে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু উচ্ছ্বসিত। মনে রাখার মতো আড়ং করলাম। টাকা দ্বিগুণ, কী ভাগ্য। আবার হুড় লাগে কিভাবে তাও দেখলাম। মাকে গল্প করা যাবে ভালো মতো।

শেষের দিকে দুই পা চলছে না যেন, ধুলায় পা-স্যান্ডেল একাকার।  তারপরও শৈশবের তনুমনে আনন্দের খেলা। হাতে থাকা জিনিসগুলো সযত্নে আগলে রাখি। যাতে না পড়ে যায়। এগুলো দেখাতে হবে সবাইকে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করছে। দ্রুত পা চালাই। আমাদের গ্রামটা কাছাকাছি মনে হচ্ছে। এই তো এসেই গেছি। ওইতো সবকিছু। ওইযে আমাদের বাড়ির আমগাছগুলো দেখা যায়। সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে মা, দুই ছেলের প্রতীক্ষায়। 

লেখক: সংবাদকর্মী

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত