artk
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার ২৬ মে ২০১৭, ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ
ব্রেকিং
সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার কাজ চলছে                    

শিরোনাম

সেই বৈশাখ, এই বৈশাখ

মুনিফ আম্মার | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ০৯১৮ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৩৫০ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭


সেই বৈশাখ, এই বৈশাখ - অসম্পাদিত
মুনিফ আম্মার (ফাইল ফটো)

ঢাকা: নানুয়া দীঘির উত্তর-পূর্ব পাড় থেকে নামলেই দিগম্বরীতলা। বড় বটগাছটি ঘিরেই প্রতিবছর জমে ওঠে বৈশাখী মেলা। মফস্বল শহর কুমিল্লায় বৈশাখ ঘিরে এ মেলাটা বেশ পুরনো। পারিবারিক বাধা আর বয়সের কারণে বৈশাখী মেলায় খুব বেশি অংশগ্রহণ ছিলো না আমার। তবে মেলা ঘিরে ভেতরে ভেতরে উচ্ছ্বাসও ছিলো অনেক। পাড়ার বন্ধু ইমরান, প্রীতু, জামাল ও কামালের সঙ্গে বড়দের চোখ এড়িয়ে মেলায় একফাঁক না গেলে ঘুম হতো না। টিফিন ও বিভিন্ন সময়ের জমানো টাকা নিয়ে মেলায় গিয়ে এটা সেটা কিনতাম ঠিকই, আব্বা আম্মার ভয়ে সেগুলো আর বাসা পর্যন্ত নিয়ে আসা হতো না।

দিগম্বরীতলার মেলায় যাওয়া নিয়ে বাধা নিষেধের বড় কারণ ছিলো জুয়ার আসর। মেলায় ছোট ছোট জটলা পাকিয়ে বেশ জমজমাট জুয়ার আসর বসতো। মুড়ি মুড়কির দোকানের চাইতেও সে আসর ঘিরে মানুষের আগ্রহ যেনো বেশি ছিলো। জুয়া খেলতো খুব অল্প মানুষ। তবে দর্শকদের হাততালি আর ভিড় করে থাকা দেখে মনে হতো, সবাই যেনো এজন্যই মেলায় এসেছে।

জুয়ার আসর যারা বসাতো, তাদের কারসাজি ছিলো খুব। ছোটবেলায় খুব অবাক হয়ে দেখতাম- তারা যা বলতো, ঘুরে ফিরে ছক্কার গুটিতে তা-ই ওঠতো। নিজেদের কয়েকজন লোক ঠিক করা ছিলো, যারা বারবার করে জিতে গিয়ে দ্বিগুন টাকা পকেটে নিয়ে নিতো। আর সেটা দেখে অন্যরাও আগ্রহী হয়ে উঠতো এ খেলায়।

একটা ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই ঘটতো দিগম্বরীতলার এ মেলায়। কিছু একটা কেন্দ্র করে বেধে যেতো ব্যাপক মারামারি। দুই পক্ষ অবস্থান নিতো মেলার দুই দিকে। দেশীয় বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র থাকতো তাদের হাতে। ভয়ে আমাদের ছোটদের দল সেই যে ঘরে ঢুকতাম, বাইরের সব হট্টগোল থামার পরে বের হতাম। দীঘির পাড়ের আড্ডায় পরবর্তী কয়েকদিন আলোচনায় থাকতো এই একটা বিষয়ই।

একটু বড় হওয়ার পরে আরও কয়েকটি মেলার খবর জেনেছি। বাসার কাছে হওয়ায় মুরাদপুর বালুর মাঠের মেলাতে তখন যেতাম দল বেঁধে। কেনাকাটার চাইতেও এ মেলা থেকে সে মেলা ঘুরে দেখাই ছিলো প্রধান কাজ। একবার মেলা থেকে কাঠের বানানো একটা গাড়ি কিনে ফেরার পথেই ভেঙে গেলো সেটা। যে বন্ধু চালাতে গিয়ে ভেঙেছে, তার সঙ্গে তো সে সময় বন্ধুত্ব ভাঙার উপক্রম হয়েছিলো। পরে অবশ্য কোকাকোলা খাওয়ানোর বিনিময়ে সে যাত্রায় সম্পর্কে আর কোনো অবনতি হয়নি।

কুমিল্লায় কেটেছে আমার ছেলেবেলা। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে লাগলাম। পরে দেখলাম- বীরচন্দ্র গণ পাঠাগার ও নগর মিলনায়তন মাঠে (কুমিল্লা টাউন হল মাঠ) বৈশাখী মেলার বড় আয়োজন। কুমিল্লা সাংস্কৃতিক জোট ধর্ম সাগর পাড় থেকে বের করতো মঙ্গল শোভাযাত্রা। জোট অবশ্য দুভাগে বিভক্ত ছিলো। নজরুল ইন্সটিটিউটের সামনে থেকে অপর অংশের শোভাযাত্রা বের হতো। শহরের দুইপাশ দিয়ে দুই পক্ষেরই বর্ণিল শোভাযাত্রা মানুষের মন কাড়তো। তবে বরাবরই ধর্ম সাগর পাড় থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রাটি ছিল বেশি আকর্ষণীয়। শহিদুল হক স্বপন ভাই ছিলেন এটা অন্যতম উদ্যোক্তা। অপর অংশে বড় ভূমিকা রাখতেন টিটুদা।

তখন আবৃত্তি সংসদ ও প্রতিবিম্ব থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বৈশাখ এলেই বেড়ে যেতো তৎপরতা। টাউন হলে নানা আয়োজনে কবিতা পড়া ও নাটক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটতো। পরে অবশ্য আমরাই একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সেতুবন্ধন নামে। কুমিল্লায় শিশু কিশোরদের নিয়ে সবচেয়ে বড় আয়োজন সম্ভবত আমরাই করতাম। প্রথমবার সেতুবন্ধন ফোরাম থেকে ‘ফুল পাখিরা ওঠলো মেতে’ নামে শিশু কিশোর উৎসব করার পরদিন তো শহরে বের হয়ে কেবল এদিক সেদিক তাকাতাম। ভাবতাম, সবাই বুঝি আমাকে চিনে ফেলেছে। এখন অবশ্য এসব ভেবে খুব হাসি পায়।

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই অনুশীলন করতো কুমিল্লা কালচারাল একাডেমিতে। এছাড়া শিল্পকলা, মহিলা মহাবিদ্যালয় ও কুমিল্লা টাউন হলেও বসতো কেউ কেউ। চৌকষ নাট্য সম্প্রদায়, আবৃত্তি সংসদ, মৃত্তিকা, অধুনা থিয়েটার, সংলাপ, প্রতিবিম্ব সে সময়ে কুমিল্লা মাতিয়ে বেড়াতো। শাহিদুল ইসলাম সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে সংলাপ-প্রতিবিম্ব থেকে পরিচয় হয় আমার। পরবর্তীতে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি অনেকখানি পথ। বাংলাদেশ আবৃত্তি অঙ্গন ছিলো আমাদের স্বপ্নের সংগঠন। তার অনুপ্রেরণায় সে সময়ে সেতুবন্ধন থেকে কুমিল্লায় অনেকগুলো আয়োজন করেছি আমরা।

সেতুবন্ধন থেকে প্রথম বৈশাখে আমরা মিলিত হয়েছিলাম রানী কুঠিরের বারান্দায়। শফিক, আল আমিন, রাসেল, লীনা, রুবি, ফারজানা কামালরা ছিল সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। আর্থিক সংকটে সেবার আমরা পহেলা বৈশাখে বিশেষ কোনো আয়োজন করতে না পারলেও চৌকষের আমন্ত্রণে পান্তা খেয়ে দিন কাটিয়েছিলাম। সেবার অবশ্য দলবেঁধে বিভিন্ন সংগঠনের বড় ভাইদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে সেটা দিয়ে বিকেলের আইসক্রিম উৎসব করেছিলাম আমরা।

সময়ের আবর্তনে কুমিল্লার বৈশাখী উৎসবগুলোতে অংশ নেয়া হয়ে ওঠে না আর। এখনও মন ছু্টে যায় শৈশব কৈশোরের কুমিল্লায়। যাপিত জীবনের নানা আয়োজনে এখনকার এই বৈশাখ আরও সাড়ম্বরে পালিত হয় ঠিকই, কিন্তু সেই বৈশাখ জুড়ে আছে আমার মননে, হৃদয়ের গভীরে।

(নানা সীমাবদ্ধতায় অনেকের নাম এ লেখায় যুক্ত করা যায়নি। প্রাসঙ্গিক অন্য লেখায় বন্ধু, সতীর্থদের নাম যুক্ত করে নেয়ার চেষ্টা থাকবে।)

লেখ: সংবাদকর্মী

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত