artk
১০ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সোমবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৩:৪৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ভ্যাট আইনকে স্বাগত জানিয়ে আপত্তি ব্যবসায়ীদের

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২১৩৪ ঘণ্টা, রোববার ১৯ মার্চ ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৮৪৯ ঘণ্টা, সোমবার ২০ মার্চ ২০১৭


ভ্যাট আইনকে স্বাগত জানিয়ে আপত্তি ব্যবসায়ীদের - বিশেষ সংবাদ

ঢাকা: অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইনের বিকল্প নেই। এই ভ্যাট আইন ব্যবসাবান্ধব ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনকে স্বাগত জানালেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে আপত্তি জানিয়েছেন।

আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন-২০১২ কার্যকর করা হবে বলে জানিয়ে আসছেন অথমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান।

সরকার এ ভ্যাট আইন কার্যকর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের নতুন আইনে ভ্যাট দিতে হবে বলে জানান তারা।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার ২০১২ সালে ভ্যাট আইন প্রনয়ণ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আজ পর্যন্ত এ আইনের বাস্তবায়ন করা যায়নি। প্রতিবছর বাজেট এলেই অর্থমন্ত্রী এ আইনের দু-একটি অংশ তুলে ধরে বলেন ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা হয়নি। আর ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা এ আইনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন।”

তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নতুন ভ্যাট আইনে ভ্যাট দিতে হবে। তবে তার আগে কিছু সংশোধন আনা হবে।”

তিনি বলেন, “নতুন ভ্যাট আইন করার পর ব্যবসায়ী মহল থেকে দাবি করা হয়েছিল ৩০ লাখ পর্যন্ত আয়কে ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। আবার কেউ বলেছিলেন ৫০ লাখ পর্যন্ত, পরে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৩০ লাখ পর্যন্ত আয় ভ্যাটমুক্ত থাকবে। এবার ব্যবসায়ীরা সে দাবি করছেন।”

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আগামী ১ জুলাই দেশে ২০১৭ ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করব। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট দিতে হবে না। ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত যাদের টার্নওভার, ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মাত্র ৩ শতাংশ ভ্যাট, তার ওপরে হলে ১৫ শতাংশ নেয়া হবে।”

এদিক দেশের ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনকে স্বাগত জানিয়ে নতুন ভ্যাট আইনের আরোপিত ভ্যাট কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, আমরা নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের পক্ষে। কিন্তু আসন্ন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে নতুন ভ্যাট আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়ার বিপক্ষে।

তারা বলছেন, এ আইন বাস্তবায়ন হলে ভ্যাট দেয়া ব্যাবসায়ীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। এতো বেশি ভ্যাট আরোপের কারণে জনগণ বা ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ফাঁকির দিকে ধাবিত হবে। তাই সঠিক রাজস্ব আহরণের স্বার্থে এ ভ্যাটের পরিমান কমাতে হবে।

তারা আরও বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে আরোপিত ভ্যাটের পরিমান না কমালে সরকার মূল লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে পড়বে। একই সঙ্গে নতুন ভ্যাট আইন ব্যবসাবান্ধব হবে এমনটি বলাও উচিৎ হবে না।

আসন্ন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে নতুন ভ্যাট আইনে ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ দাবি করছেন ব্যবসায়ীদের পক্ষে থেকে ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাশেম খান।

ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাশেম খান নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “নতুন ভ্যাট আইনে সরকার সবার ওপর খুচরা পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩০ শতাংশের বেশি অবাদান রাখে অতি ক্ষুত্র ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাত । বেসরকারি খাতে ৭৫ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ খাত সংক্রান্ত। দেশের কর্মসংস্থানের ৭৫ শতাংশ হয় এমএসএমই খাতের মাধ্যমে। শিল্প খাতে চাকরির ৮০ শতাংশই এমএসএমই ভিত্তিক। তাই নতুন ভ্যাট আইনে খুচরা পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে এসএমই ব্যবসায়ীরা মারাত্মভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে।”

একই সঙ্গে তিনি বলেন, “বড় ব্যবসায়ীদের টার্নওভার ট্যাক্স লিমিট বর্তমানে ৮০ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার শূন্য থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ভ্যাট মুক্ত ও ৫০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি ২০ লাখ পর্যন্ত ৩ শতাংশ করতে হবে। এছাড়া প্রত্যেক ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন হোল্ডারদের সরকারি খরচে ইসিআর মেশিন স্থাপনসহ ভ্যাট স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করতে হবে।”

এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেন, “নতুন ভ্যাট আইনেও জনসাধারণের সুবিধায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে কোনো ভ্যাট আরোপ করা হবে না। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীরা ৩০ লাখ টাকা পযর্ন্ত ভ্যাট অব্যাহতি পাবেন। আমরা একে কার্যকর করে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করব।”

নতুন ভ্যাট আইনে ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে (এসএমই) করের আওতামুক্ত রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসার করমুক্ত পরিসীমা কয়েকগুন বাড়ানোর ফলে দেশে এসএমই শিল্প বিকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে মনে করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

বিদ্যমান ভ্যাট আইন, ১৯৯১ এর অধীনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে কোন না কোন নামে সামান্য পরিমাণে হলেও ভ্যাট দিতে হয়। তবে নতুন আইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সূর্ম্পণভাবে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে এই আইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সর্বোচ্চ সীমা ৭ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে। নতুন অনলাইন ভ্যাটের আওতায় যে ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত তাকে নিবন্ধন নিতে হবে না। কোনো নামে কোথাও কোনো ধরনের ভ্যাট দিতে হবে না।

এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তারা (এসএমই) মূল ভূমিকা পালন করছেন। এজন্য নতুন আইনে আমরা তাদের প্রতি বিশেষ ফোকাস দিয়েছি। ব্যবসাবান্ধব এই ভ্যাট নীতি বাংলাদেশের এসএমই শিল্প বিকাশে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।”

তিনি বলেন, “নতুন ভ্যাট আইনে ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীরা আগের আইনের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাবেন।” আগের ভ্যাট আইনের উত্তম চর্চাগুলো নতুন আইনে সংযোজন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “আগামী ১ জুলাই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু হবে। ইতোমধ্যে আমরা এর দিন গণনা শুরু করেছি। এই আইন বাস্তবায়নের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবসায়ীদের ১৫ মার্চ থেকে অনলাইনে নিবন্ধন নিতে বলা হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এবার নিবন্ধন নিতে হচ্ছে না।”

তিনি জানান, নতুন ভ্যাট আইনের ক্ষেত্রে আমাদের স্লোগান হচ্ছে ‘নতুন ভ্যাট আইন হবে পানির মত সহজ ও স্বচ্ছ’।

নতুন ভ্যাট আইন প্রসঙ্গে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপ-পরিচালক ও অতিরিক্ত কমিশনার (ভ্যাট) জাকির হোসেন নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “নতুন আইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করমুক্ত যে সুবিধা দেয়া হয়েছে, তা সবসময় বহাল থাকবে। কেননা এনবিআর চাইলেও কোন প্রজ্ঞাপন বা এসআরও জারি করে এই সুবিধা প্রত্যাহার করতে পারবে না। নতুন আইনে এর পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখা হয়নি।”

নতুন এই আইনে অনলাইনে নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল করা যাবে, এতে ব্যবসায়িক হিসাব রাখা পুরনো আইনের তুলনায় অনেক বেশি সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিক, বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে প্রথম ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এরপর ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। আগামী অর্থবছর অর্থ্যাৎ ১ জুলাই থেকে এটি বাস্তবায়ন হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএজেড/এজে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য