artk
১ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বুধবার ১৬ আগস্ট ২০১৭, ৮:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

কাউন্সিলের বর্ষপূর্তি
‘সরকারের বাধা’ ডিঙিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ বিএনপি

রফিক রাফি | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৭২২ ঘণ্টা, শনিবার ১৮ মার্চ ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৩৫৭ ঘণ্টা, রোববার ১৯ মার্চ ২০১৭


‘সরকারের বাধা’ ডিঙিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ বিএনপি - বিশেষ সংবাদ

ঢাকা: ৬ষ্ঠ কাউন্সিলে দলের ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয় দেশের অন্যতম রাজনৈতি দল বিএনপি। পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনতে বিভিন্ন পরিকল্পনাও গ্রহণ করে দলটি। কিন্তু কাউন্সিলের পর এক বছরে সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি দলটি।

তবে দলের নেতারা বলছেন, সরকারের নানা বাধা ডিঙিয়ে সংগঠন গোছানো, গণন্ত্রের পক্ষে কাজ করাসহ নানা দিক দিয়ে এগিয়েছে বিএনপি।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলকে ঘিরে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর আশায়’ বুক বেঁধেছিলেন দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। কিন্তু কাউন্সিলে ঘোষিত দলের সিদ্বান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি এক দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি। এমনকি দলীয় গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করে বই আকারেও প্রকাশ করতে পারেনি তারা। কার্যত গঠনতন্ত্র ছাড়াই চলছে বিএনপি। সবকিছু মিলিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কাজ করছে হতাশা।

নেতারা দাবি করছেন, পরিবেশ পরিস্থিতি ‘অনুকূলে’ না থাকায় সেসবের বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়নি । শতভাগ সফল না হলেও অনেকটা এগিয়েছে দল। আবার অনেকের দাবি, জাতীয় সম্মেলন হয়েছে কিন্তু দলের সাংগঠনিক ব্যর্থতার করণে সিদ্বান্তগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য রাজপথে আন্দোলনেও তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে একের পর এক জাতীয় ইস্যু হাতছাড়া হয়ে আন্দোলনের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছে দলটি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিল-পরবর্তী কমিটি ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী কমিটির তিনটিসহ একাধিক পদ এখনো ফাঁকা। অঙ্গ-সংগঠন ও তৃণমূল পুনর্গঠন এখনো শেষ হয়নি। পাশাপাশি বিএনপিতে এক ব্যক্তির এক পদ গৃহীত নীতিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কেউ কেউ একাধিক পদ থেকে পদত্যাগ করলেও বেশ কয়েকজন বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে পদ আঁকড়ে আছেন।

জানা গেছে, এখনো পর্যন্ত দলীয় গঠনতন্ত্র বই আকারে প্রকাশ করতে পারেনি বিএনপি। কবে নাগাদ এটা হবে তা দলের কেউ বলতে পারছেন না। গঠনতন্ত্র প্রকাশ না হওয়ায় বিএনপির নির্বাহী কমিটি কত সদস্যবিশিষ্ট বা নতুন কী সংশোধনী আনা হলো, এর কিছুই জানে না নেতাকর্মীরা। প্রায় প্রতিদিন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী নয়া-পল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গঠনতন্ত্র নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। এজন্য ২০০৯ সালের পুরনো গঠনতন্ত্র ধরেই কাজ করে যাচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। অনেক ক্ষেত্রে নতুন গঠনতন্ত্র না পাওয়ায় সাংগঠনিক অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিভিন্ন পর্যয়ের নেতারা।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চাইলে তারা জানান, গঠনতন্ত্র এখনো ছাপা হয়নি। ২০০৯ সালের পুরনো গঠনতন্ত্র রয়েছে। কবে নাগাদ নতুন গঠনতন্ত্র পাওয়া যাবে তা তারা জাননে না।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী কাজ চলছে।

এক বছর আগে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের খসড়া গঠনতন্ত্রে উল্লেখ ছিল, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ২৬টি উপকমিটি হবে। প্রতিটি উপকমিটিতে সর্বোচ্চ ১২ জন সদস্য থাকবেন। কিন্তু ওই কমিটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। আদৌ ওই কমিটি হবে কিনা তা নিয়েও সন্দিহান দলের নেতা-কর্মীরা। এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কেউ জানে না।
গঠনতন্ত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, দলের সদস্য ফি ৫ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করা হয়। কেউ মাসিক চাঁদা ৬ মাস না দিলে তার পদ স্থগিত করা হবে। আর এক বছর না দিলে পদ বাতিল করা হবে। আর টানা দুই বছর চাঁদা না দিলে তার প্রাথমিক সদস্য পদ স্থগিত করা হবে। তিন বছর না দিলে প্রাথমিক সদস্য পদও বাতিল করা হবে। নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ১৭ থেকে ৩৫ জন। উপদেষ্টা পদ চেয়ারপারসন যত খুশি তত রাখতে পারবেন। সাংগঠনিক সম্পাদক প্রতি বিভাগে একজন ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক থাকবেন প্রতি বিভাগে দু’জন। কাউন্সিলে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র ধরেই ৫০২ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা দেয়া হয়। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ড, থানা, উপজেলা, জেলা ও মহানগর কমিটির রূপরেখা তৃণমূলে পাঠানো হয়।

তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কাউন্সিল অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই মেনে চলছে না বিএনপি। স্বল্প পরিমাণে মাসিক চাঁদা দেয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ নেতাই মাসের পর মাস বকেয়া রাখছেন। গঠনতন্ত্র না থাকায় এ ব্যাপারে সাংগঠনিক বিধিও প্রয়োগ করতে পারছে না দলটি।

একাধিক নেতাকর্মী জানান, সরকারের নানামুখী চাপের মধ্যেও বিএনপি সফল একটি কাউন্সিল সম্পন্ন করেছে; কিন্তু সেই সফলতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ সম্মেলনের সাড়ে চার মাস পর গত ৬ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা আসে, যা দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কমিটি। স্থায়ী কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ, ভাইস চেয়ারম্যানসহ ৫৯২ জনের নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। গত এক বছরে এ বিশাল আকৃতির কমিটি কোনো সাফল্যের মুখ দেখাতে পারেনি। বরং এতে পদবঞ্চিত ও অবমূল্যায়নের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মাঝে দেখা দেয় ক্ষোভ। তাদের অনেকেই দলীয় কার্যক্রমে এখনও নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্তদের অধিকাংশই গা বাঁচিয়ে চলছেন।

নেতারা আরো জানান, কাউন্সিলের লক্ষ্য ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার-নির্যাতনসহ নানা কারণে সৃষ্ট নেতাকর্মীদের হতাশা কাটিয়ে দলকে চাঙ্গা করা। এজন্য ওই সময় থেকে তৎপরতাও শুরু করে দলটি। কেন্দ্রের পাশাপাশি সারা দেশে জেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের জন্য কয়েক দফা উদ্যোগও নেয় বিএনপি।

বিএনপির দপ্তর বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশিরভাগ জেলায় কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে কমিটি দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। ঘোষিত কমিটি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। ১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়ার পর সৃস্ট অসন্তোষ ক্ষোভ অবিশ্বাস থেকে বের হতে পারেননি নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে কমিটি পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে এটা বেড়েছে। কমিটি ঘোষণা হওয়া মাত্র আশানুরুপ পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন।

বিএনপি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া, এটার কোনো মেয়াদ নেই। যেখানে সমস্যা দেখে দেবে সেখানেই কাজ হবে। এটার শেষ নাই। টাইম ফ্রেম বেঁধে দিয়ে সাংগঠনিক কাজ হয় না।”

এদিকে এ কাউন্সিলের তেমন একটা প্রভাব পড়েনি বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সিংহভাগে। দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষণা নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর, যা এখনও চলমান। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ ও হতাশা। বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ৯টি ও সহযোগী সংগঠন ২টি। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ৪টি (স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল, মহিলা দল ও জাসাস) এর আংশিক কমিটি দেয়া হয়েছে। বাকি রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা দল, কৃষকদল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল, ছাত্রদল এবং শ্রমিক দল।

দলের অঙ্গসংগঠনের বিষয় গয়েশ্বর বলেন, “প্রতিটি সংগঠনে কিছু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি আছে। এছাড়া দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাবে যার যে দায়িত্ব পালন করার কথা তা পারছে না। অনেকে আবার এসব কারণ দেখিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চায়।”

এদিকে কাউন্সিলের মাধ্যেমে দলকে যুগ-উপযোগী করার প্রত্যায় ব্যক্ত করা হলেও জঙ্গিবাদ, সংখ্যালঘু, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হাত ছাড়া করেছে বিএনপি। এ ছাড়া বিতর্কিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুললেও এ ইস্যুতে শক্ত প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি বিএনপিতে। এমনকি কূটনৈতিক অঙ্গনেও দলটির কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। দলটির কূটনৈতিক উইংয়ের অন্যতম সদস্য শমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ, ড. ওসমান ফারুকের বিরুদ্ধে মামলা আর অন্য সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও বাংলাদেশে সফররত বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলটির চেয়ারপারসন।

এছাড়া কাউন্সিলে ঘোষিত ভিশন- ২০৩০ পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আকারে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করার জন্য চেয়ারপারসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু গত এক বছরেও তা সম্পন্ন হয়নি।

অন্যদিকে কাউন্সিলে ঘোষিত বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘ভিশন-২০৩০’ অগ্রগতি সম্পর্কে স্থায়ী কমিটি সদস্য (অব.) লে. জে. মাহবুবুর রহমান বলেন, “ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা একটি চমৎকার যুপোপযোগী উদ্যোগ, এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। চূড়ান্ত হলেই তা প্রকাশ করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।”

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমরা কিছু বেসিক জিনিস নিয়ে কাজ করছি। বিএনপি ভিশন ২০৩০ নিয়ে কাজ করছে। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে কাজ করছি। আমরা জনগণকে আগামীতে কী দেবো সেসব নিয়ে কাজ করছি। কোন কোন ইস্যুতে কী বলব সেসব নিয়ে কাজ হচ্ছে। আগামী দেড় দু মাসের মধ্যে তা প্রকাশ করা হবে।”

দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু বলেন, “সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বে আমাদের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল দলীয় সম্মেলন করা। ১৯ মার্চ বিএনপি একটি সফল সম্মেলন করেছে। কিন্তু গত এক বছরে আমরা শতভাগ সফল হতে পারিনি। কিন্তু সরকারের নানা বাধা ডিঙিয়ে সংগঠন গোছানো, গণন্ত্রের পক্ষে কাজ করাসহ নানা দিক দিয়ে এগিয়েছে বিএনপি।”

২০১৭ সাল গণতন্ত্রের জন্য অগ্রগতির বছর হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/আরআর/এজে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত