artk
৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বুধবার ১৮ অক্টোবর ২০১৭, ১:১৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

উচ্ছ্বাসের বিজার্ভে বেদনার বিদায়
আতিউর রহমানের বিদায়ের এক বছর

সাইদ আরমান | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৮৪৬ ঘণ্টা, বুধবার ১৫ মার্চ ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১১৪৩ ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ১৬ মার্চ ২০১৭


আতিউর রহমানের বিদায়ের এক বছর - বিশেষ সংবাদ

ঢাকা: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদ থেকে ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগের এক বছর বুধবার। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকারে ইচ্ছায় পদত্যাগ করেন আতিউর রহমান। গত বছরের ১৫ মার্চ আতিউর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে যান গুলশানের গভর্নর ভবনে।

সেখানে সংবাদ সম্মেলন করে বিদায়ের কথা জানান মানবিক গভর্নর হিসেবে পরিচিত আতিউর রহমান। তার বিদায়ের পর গভর্নর পদে দায়িত্ব দেয়া হয় সাবেক আমলা ফজলে কবিরকে। যিনি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে অর্থসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে দায়িত্বভার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব দেয়া হয় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির জন্য জড়িত আতিউর রহমানকে। ২০০৯ সালের মে মাসে তিনি এই পদে নিয়োগ পান। চার বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। তবে সব মিলিয়ে ৭ বছর দায়িত্ব পালন করে বিদায় নিতে হয় আতিউরকে।

সরকার প্রধানের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরে দ্বিতীয় মেয়াদে আবার নিয়োগ পান আতিউর রহমান। বয়সের আইনি কাঠামো থাকাতে ৬৫ বছর পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে হিসেবে আতিউর রহমানের মেয়াদ শেষ হতো গত বছরের আগষ্ট মাসে।

আতিউর রহমান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনায় ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন।

জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আমি শিক্ষক মানুষ। ছাত্র/ছাত্রীদের ক্লাস নিয়েই ব্যস্ত আছি।”

তবে তিনি যেহেতু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে মানবিক ব্যাংকিংসহ নানাভাবে উদাহরণ তৈরি করেছেন ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের আন্তর্জাতিক সংস্থায় তাকে অতিথি হিসেবে ডাকা হয়।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি করে সরকার। এতে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস এবং বুয়েটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ।

কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও অর্থ উদ্ধারে বাধা তৈরি হতে পারে যুক্তিতে আজও প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি সরকার। মুহিত একাধিক বার প্রকাশের ঘোষণা দিলেও সেখান থেকে সরে আসেন। ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকও প্রতিবেদনের তথ্য জানতে চেয়েছে। 

সূত্র বলছে, প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাকের রিজার্ভ লুটের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের কোনো একক দায় নেই বলে ওঠে এসেছে। তবে তিনি বিষয়টি গোপনের চেষ্টায় অপরাধ করেছেন বলা হয়েছে। গোপন করার চেষ্টা রীতিমতো অসদাচরণ। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এমনটি করার কোনো দরকার ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের ঘটনার প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এ সংক্রান্ত কমিটি। মে মাসের মাথায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন কমিটি।

সূত্রগুলো বলছে, আতিউর রহমানের বিদায়ের পর ফজলে কবিরের দায়িত্বভার গ্রহণে বড় পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। আতিউর রহমান নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অনেক দায়িত্ব দেশ ও অর্থনীতির জন্য বাস্তবায়ন করেছেন। এমনকি, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে অর্থ দিতেও প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলেন আতিউর রহমান। 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “আতিউর রহমান তার মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। যা দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় কাজ হিসেবে দেখতেই হবে। তিনি ব্যাংকিং খাতকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে প্রতিনিয়ত কাজ করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “অনেক ভালো কাজের মধ্যে কিছু সমালোচনাও তাকে মানতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক। এর বেশি উদার হবার কোনো সুযোগ নেই। তবে আতিউর রহমানের মেয়াদে সেটি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আতিউর রহমানই একমাত্র, যাকে এভাবে বিদায় নিতে হয়। যে রিজার্ভ আতিউরের জন্য ছিল ‘আনন্দ আর উচ্ছাসের’, তার একটি ঘটনাতে বিদায় নিতে হলো তাকে।”

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে গচ্ছিত বাংলাদেশের রিজার্ভের ১০ কোটি ডলার ‘হ্যাকিংয়ের’ মাধ্যমে লোপাট হওয়ার খবরটি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ পায়।

শুরুতে টের পেলেও তা অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায়নি আতিউর। এতে তার উপর ক্ষুব্ধ হন মুহিত। এর মধ্যে গভর্নর ভারত সফরে গেলে তার সমালোচনাও করেন অর্থমন্ত্রী।

এভাবে বিদায় যে চাইছিলেন না, তা ফুটে উঠে আতিউরের কথায়- “হয়ত আমার এক্সিটটা আরও ভালো হতে পারত... (মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার) সময়ও তো বেশি বাকি ছিল না। যাই হোক, এখন আর আমি সেগুলো ভাবছি না। মান-সম্মান নিয়ে বিদায়ই নিতে চাচ্ছি।”

২০১৫ সালে লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস তাকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংকার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল। গরিবের অর্থনীতিবিদ’ অভিহিত করে ২০১৩ সালে ফিলিপিন্সের গুসি পুরস্কার দেয়া হয়েছিল আতিউরকে। এছাড়া ভারতের ইন্দিরা গান্ধি গোল্ড মেডেলও পেয়েছেন তিনি।

আতিউরের জন্ম ১৯৪৯ সালে। টাংগাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন ১৯৮৩ সালে।

মাস্টার্স পড়ার সময়ই বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আতিউর রহমান। ১৯৮৩ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্টানে (বিআইডিএস)।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসএ/এএইচকে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য