artk
১৫ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার ২৮ এপ্রিল ২০১৭, ৪:১৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম

নারীর ঐশ্বর্য আর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের ডাক

ফেরদৌসি বিকন |
প্রকাশ: ১৬৪৬ ঘণ্টা, বুধবার ০৮ মার্চ ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৬৫০ ঘণ্টা, বুধবার ০৮ মার্চ ২০১৭


নারীর ঐশ্বর্য আর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের ডাক - নারী

ভাবছি আজ নারী দিবসে কী লিখবো? আমার নারীবাদ মানে তো, আমি জনম জনম ধরে নারী হয়েই জন্মাতে চাই। আমার নারীজন্ম স্বার্থকতা পেয়েছে, ঐশ্বর্যময় হয়েছে, আমার দেশের মহাপুরুষদের কাব্যে। আমি তাই জীবনভর অর্ধেক মানবী আর অর্ধেক পুরুষের (রবীন্দ্রনাথের) কল্পনা হয়েই থাকতে চাই।

আমার কাছে প্রশ্ন এসেছে, “কাব্যিকতা আর বাস্তবতার মধ্যে কোনো সাদৃশ্য নেই। মেয়ে হয়ে জন্মানো কী আসলেই স্বার্থক?”

মনে হচ্ছে প্রশ্নটাতে জীবন সংগ্রামে নারী জন্মের ব্যর্থতার সুর আছে। কারণ নারী এই প্রশ্নে একক সত্ত্বা, পুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার মনে হয় ‘আধুনিক নারীবাদ’ এই পুরো কনসেপ্টটাই অত্যন্ত সেনসেটিভ একটা ব্যাপার। এখানে মোটেও অস্থিরতা চলবে না।

সমাজে নারীর মুক্তির যে ধারণা, এটাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘নারীর মুক্তি’ না বলে ‘নারীর বিকাশ’ বলা যেতে পারে। কারণ বর্তমানে সমাজে নারীর অবস্থানের বিভিন্ন ধাপ তৈরি হয়েছে। এ কথা ঠিক, কিছু শ্রেণির নারী হয়তো বন্দী হয়ে আছে, অত্যাচার এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারী। এই নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির ঠিক আরেক ধাপ ওপরে আরেক শ্রেণির নারী আছেন। এরা উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং বিত্তবান শ্রেণির নারী।

বাহ্যিকতার দিক থেকে এদের প্রায় মুক্তই বলা চলে। সুতরাং এদের মুক্তির দাবি অহেতুক, এদের বিকাশের প্রয়োজন। মানুষের মুক্তি আসে বিকাশের মধ্যে দিয়ে। এদের পরিপূর্ণ বিকাশ হলে এরাই নিম্ন মধ্যবিত্ত নারীদের মুক্তির আবশ্যকতা অনুভব করবে। একটি পরিপূর্ণ সত্ত্বা অনাদিকাল ধরে অন্যের মুক্তির মধ্যেই নিজের মুক্তি খুঁজে ফিরেছেন। পরিপূর্ণ সত্ত্বার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এরাও তাই করবে। এদের সঠিক উদ্দেশ্যের অনুধাবন চাই কেবল।

যে জায়গাটাতে আমাদের স্পষ্টতা চাই তা হলো আমাদের লক্ষ্য কী? আমরা কোথায় পৌঁছুতে চাই? সেখানে পৌঁছাবার উদ্দেশ্য কী? কেন এতো হাহাকার সেখানে পৌঁছুবার জন্য? এসবই নানাবিধ প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খোঁজে বাধা, বিপত্তি ও তর্ক হাজারো আসতে পারে। নানা জনের নানা মতামত থাকবে সেই লক্ষ্যকে ঘিরে। আবার অনেকে সঙ্গে থাকবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে থেমে গেলে চলবে কেন?

আজকের দিনের মেয়েরা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে নারীর জাগরণ যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয় এর প্রথম ধাপ হোক পুরুষকে এ আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা। নারীকে অনুপ্রাণিত করতে চাইলে কঠোরভাবে নারীর ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এর কারণ হলো- আমরা সাধারণত যা হাইলাইট করছি সেটাই প্রমোট হচ্ছে।

গরিব দেশের কথা ভাবলেই আফ্রিকা এসে পড়ে ভাবনায়। কারণ তাই প্রমোট করছে উন্নত বিশ্ব, আর আফ্রিকার ভাগ্যেরও পরিবর্তন হচ্ছে না। কিন্তু আফ্রিকার কোনো উন্নতি একেবারেই যে ঘটছে না তা কিন্তু নয়। নারীরা দুর্বল বলেই তাদের ওপর কর্তৃত্ব চলে, শাসন চলে। কিন্তু তাতে যে একেবারেই পরিবর্তন আসেনি তা কিন্তু নয়। আর মেয়েদের দুর্বলতার জন্য কেবল পুরুষরাই দায়ী নয়। দীর্ঘপথ অতিক্রম করেও মেয়েরা পুরুষদের অধীনস্থ হয়েছে।

যদি বলি, কেন হয়েছে এমন অন্যায়? তাহলে বলতে হবে তার সঙ্গে যুগ-যুগান্তরের ধর্মীয় এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয় জড়িত। মেয়েদের নিজের ভূমিকাও যে এখানে কিছুই নেই তাও নয়। নিম্ন শ্রেণির মেয়েরা, যারা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এদের পরিবর্তন এদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার দেশের সরকার এবং আইনের কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু উচ্চবিত্ত শ্রেণির লেখাপড়া জানা মেয়েরা, যারা শত সুযোগ সুবিধা থাকা সত্বেও যখন গণ্ডি ভেঙে, নিজেদের দায়িত্ব নিতে চায় না, সে গ্লানি কার? এর জন্য ও কি পুরুষরাই দায়ী?

পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে উদ্বুদ্ধ আধুনিক নারীবাদের যে ধারণা সেটা নতুন প্রজন্মের বাঙালির জন্য ভয়ঙ্কর। আমাদের সংস্কৃতিকে আধুনিক নারীবাদী লেখকরা অসমাপ্ত এবং অবিশ্লেষিত পশ্চিমা নারীবাদের অন্তর্ভুক্ত করে মহা অন্যায় করেছেন পুরো জাতির ওপর। আমাদের সংস্কৃতিতে পশ্চিমা নারীবাদকে প্রতিষ্ঠা করার আগে কি একবার ভাবা উচিত নয় আমরা সভ্যতার দিক থেকে, জাতিগত মননে, রাষ্ট্রীয় নীতিমানে পশ্চিমের সমকক্ষ হয়েছি কিনা? আর তাছাড়া যদি কোনোদিন আমরা পশ্চিমের সমকক্ষ হইও নিজের সংস্কৃতিকে কি বিসর্জন দিতে পারবো? অন্তত সেদিক থেকে হলেও তসলিমা নাসরিন আর হুমায়ুন আজাদ স্যারের কথিত নারীবাদ সুশীল বাঙালি সমাজে আজীবন মাথা হেট করেই থাকবে।

যুগ যুগ ধরে কতো পুরুষের অক্লান্ত ধৈর্য, ত্যাগ ও নিষ্ঠা ছাড়া আজ হয়তো তাদের নিজের অস্তিত্বের ও কোনো চিহ্ন থাকতো না। কিন্তু হঠাৎ একদিন এসে, পশ্চিমা গবেষণার ফলশ্রুতিতে প্রাপ্ত পশ্চিমা জ্ঞানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা বলে দিলেন পুরুষ নারীকে বন্দী করেছেন! গবেষণার সীমাবদ্ধতা হলো সেটা যন্ত্র আবিষ্কারের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। কিন্তু মানুষ আর মানুষের অন্তরের প্রেম আর ভালোবাসা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গবেষণার অবস্থান কতটুকু তা হয়তো গবেষকরাই ভালো বলতে পারবেন। এ রহস্য যেদিন আবিষ্কার করবেন গবেষণা আর গবেষক দুইয়ের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে বইকি।

কিছু নারীবাদী লেখক সীমাবদ্ধ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি উন্নয়নের পদ্ধতিকে মানব জীবনের সবচাইতে জটিল এবং সংবেদনশীল বিষয় নর-নারীর সম্পর্কের রহস্যকে উদঘাটনে প্রয়োগ করে বসলেন। নর-নারীর প্রেম আর ভালোবাসাকে সংসারের সুখ-শান্তি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর বন্ধনকে ওনারা টুকরো টুকরো অংশে, খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে দেখালেন কীভাবে নারীর মুক্তি আসে। অথচ এই প্রতিটা খণ্ডকে এক করে জোড়া দিলেই হয় সেই ছবি, যাকে আমরা বলি প্রেম, ভালোবাসা, জীবন ও বেঁচে থাকা।

খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিল আমাদের বাংলাদেশের নারীবাদী লেখক হুমায়ুন আজাদ স্যারের জীবন? উনি নিজের স্ত্রীকে কোনোদিন এক মুহূর্তের জন্যও কি দিতে পেরেছিলেন উনার বর্ণিত সেই মুক্ত নারীর জীবনের আস্বাদ? উনার স্ত্রী যদি এতটুকু ত্যাগ স্বীকার না করতেন, যদি উনার অভিযুক্ত নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের সেই মহিমাময়ী, মমতাময়ী নারীর অস্তিত্ব এতটুকু উনার স্ত্রীর মধ্যে না থাকতো একজন বিবাহিত পুরুষের পক্ষে উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনে, তিন সন্তানের পিতা হয়ে কি করে সম্ভব হতো তিনবার পিএইচডি করে আরো বিবিধ গ্রন্থসহ ৪০৬ পৃষ্ঠার বিতর্কিত ‘নারী’ প্রবন্ধটি রচনা করা?

জীবনেকে নিয়ে একটা কথা আছে, ‘জীবনযুদ্ধ’। যেকোনো যুদ্ধেই এক পক্ষের হার হলে অন্য পক্ষের জিত হয়। তবে সংসারের এই যুদ্ধে হার-জিত বলে কিছু নেই। এখানে অনেকে হেরে গিয়েই সর্বাপেক্ষা জয়ী হন।

নারীকে পুরুষ দাসী করেছে, কামের বস্তুতে পরিণত করেছে, তার সব অধিকার হরণ করে তাকে পুরুষের অধীনস্থ করেছে, এটা কোনো যুক্তিসংগত আলোচনা হতে পারে না। দুজন মানুষের অবস্থান যেকোনো সমাজে, যে কোনো দেশে, যেকোনো পরিস্থিতিতে কতটা সমকক্ষ হতে পারে সেটা কি দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মেপে বের করা সম্ভব? নারীকে যদি পুরুষ ভোগ করেই থাকে, নারী কি কোনো অবস্থাতেই পুরুষকে কোনোভাবেই ভোগ করছে না? কামের তৃষ্ণা কি পুরুষের একারই আছে কেবল? নারী কি মরা কাঠ, কেবল জড় বস্তু? বরং একজন সুস্থ নারীর শারীরিক চাহিদা একজন পুরুষকে ছাড়িয়ে যায়। আবার ঠিক একইভাবে সেই একই নারীই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা সেই পুরুষের চাইতে শতগুণ বেশি ধারণ করে।

কেন নারীর এই পার্থক্য? না এটা পুরুষের সিদ্ধান্ত নয়। আমি আমার সব লেখায় বারবার বলি, ‘নারী তার মানবিকতাকে লালন করে আপন গর্ভে, তাই এই পার্থক্য। অবশ্য সব নারী নয়, শুধুমাত্র একজন রুচিশীল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বাভাবিক নারী। আর ঠিক এখানেই, কেবল এখানেই কিছু সংখ্যক নারী-পুরুষ একে অন্যের সমকক্ষ হন। যেখানে এসব নারীদের মতো রুচিশীল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষরা তাদের সমকক্ষ নারীর খোঁজে থাকেন। কখনোবা এরা একে অন্যের সান্নিধ্যে এসে একে অপরকে আবিষ্কার করেন।

এবার এদের দুজনের মধ্যে কে কাকে ভোগ করলো, কে কার পা মালিশ করলো, কে বউয়ের গোলাম হল, কে স্বামীর দাসী হলো সেটা কি তাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের অধিকার নয়? এই সুখ-দুঃখ ছাড়া মানব সংসারের প্রেমের, বন্ধনের, হৃদ্যতার, অভিমানের, ব্যথার কি কোনো মূল্য থাকতো? আমরা যদি সবাই সবার সমকক্ষ হই, কিসের প্রয়োজন হবে আমাদের একের অন্যকে? কেমন করে জানবো, কেন একজন অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন সফল নারী/পুরুষ একজন সাধারণ নারী/পুরুষের ক্ষুদ্রতাকে, সাধারণত্বকেই অসাধারণ ভেবে আজীবন আঁকড়ে ধরে থাকেন?

কেমন করে জানবো জগতে একমাত্র প্রেমই পারে নারী-পুরুষের সব শ্রেষ্ঠত্ব আর ক্ষুদ্রতাকে এক করে বিলীন করে দিতে? কেমন করে জানবো জগতের এই মোহনিয়া সৃষ্টিসুখকে অবিরত উপভোগ্য যে করে তুলছে সে পুরুষের চোখে নারীর ঐশ্বর্য আর নারীর চোখে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের ডাক ছাড়া আর কিছুই নয়?

লেখক: ফেরদৌসি বিকন, ডাবলিন ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত