artk
১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ৩০ মে ২০১৭, ৭:০৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

শুরু করতে হবে আপনার ঘর থেকে: তামান্না সেতু

সোস্যাল মিডিয়া ডেস্ক | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২০৪০ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১০ জানুয়ারি ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২০৪২ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১০ জানুয়ারি ২০১৭


শুরু করতে হবে আপনার ঘর থেকে: তামান্না সেতু - টুইট-ফেস

“মফস্বল বা এই শহরটাও যতদিন পর্যন্ত এতখানি শহর না হয়ে উঠেছিল, প্রত্যেকটা এলাকায় at least একটা খেলার মাঠ ছিল। সেই জায়গাটা... ঢাকাতে যখন দেখলাম যে নেই এবং আমি নিজেও একটা সময় মা হলাম, আমি যেই ঊর্বর শৈশবটা কাটাতে পেরেছি, যখন দেখলাম আমার সন্তান এবং আরো অনেক সন্তানেরাই পারছে না, তখন প্রথম উদ্দেশ্যই ছিল যে, ওদেরকে একটা সুষ্ঠু শৈশব ফিরিয়ে দেয়া।

প্রতিটা মানুষই ততক্ষণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে না যতক্ষণ সে প্রকৃতির কাছে না যায়। মানুষ যত বেশি প্রকৃতির কাছে যাবে ততই বেশি মানুষ হয়ে উঠবে। সেই ইচ্ছাটা থেকে প্রকৃতির কাছে বাতিঘরকে নিয়ে যাওয়া বা প্রকৃতির একটা অংশকে মাঝে মাঝে বাতিঘরে নিয়ে আসার চেষ্টাটা করেছি।

আমার মা চেয়েছিলেন যে আমি যেন গান শিখি। আমি গান শিখেছি। ১১ বছর গান শিখেছি। একটা দিন যখন আমি কাউকে আবৃত্তি করতে দেখলাম, আমার মনে হলো... গান তো আমি ভালবাসিই, আবৃত্তিকেও ভালোবাসি। কিন্তু ততদিনে ১১ বছর আমি গান শিখে ফেলেছি। সেই জায়গাটা ধরে বাতিঘর চেয়েছে যে, প্রথমে একটা বাচ্চাকে বাংলা সংস্কৃতির সবগুলো ধারার সাথে আমরা পরিচয় করিয়ে দিই। সংস্কৃতির সবগুলো ধারার সাথে আগে সে পরিচিত হোক... তারপরে বাচ্চা নিজে সিদ্ধান্ত নিক যে, সে আসলে বড় হয়ে কী হতে চায়।

বাতিঘরে মৃৎশিল্প ক্লাস হয়, মাটি দিয়ে কাজ করে। কুমোরপাড়া থেকে মাটি আসে। ওরা মাটি দিয়ে নানান কিছু বানাচ্ছে। আসলে এই যে, নানান কিছু বানাচ্ছে... আমাদের উদ্দেশ্য এমন ছিলো না যে, তারা অনেক বড় বড় কিছু জিনিস বানিয়ে খুব স্বনামধণ্য শিল্পী হোক। আমাদের ইচ্ছে ছিল প্রথমত তারা মাটিটাকে স্পর্শ করুক।

আমরা ওদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাই। ওরা এটাকে বলে... গাছ চেনা, ফুল চেনা, পাখি চেনা। সেটা এখনো পর্যন্ত ঢাকার ভিতরে কোনো সবুজ-শ্যামল জায়গা ওরা প্রতিবার ঘুরতে যাবে, গিয়ে ৫টা করে গাছ চিনবে। এমন করে দেখা যায় যে, ওরা দেড় বছর পরে বাংলাদেশের ৪০টি থেকে ৪৫টি গাছকে নাম ধরে ডাকতে পারে। ওরা যখন পথ দিয়ে হেঁটে যাবে তখন ওরা ওদের বাবা-মাকে দেখিয়ে বলতে পারে... মা, ওটা বকুল গাছ, ওই গাছে বকুল ফুল ফোটে, ছোট ছোট সুন্দর ফুল... আমি ওটা দিয়ে তোমাকে মালা বানিয়ে দিতে পারব।

খুব মজার একটা কাজ আমরা করি। সেটা হচ্ছে... আমরা ছোটবেলায় করতাম... মাকে চিঠি লিখতাম, বাবাকে চিঠি লিখতাম... এবং আমার মনে আছে যে, যখন কোনো আপনজনের কাছ থেকে একটা কাগজে লেখা একটা চিঠি হাতে পেতাম... সে অনুভূতি, সে ভালোবাসা... সেগুলোতো আসলে কালের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে... বাতিঘরে আমি এটা করি। ওদের একটা... মাসে একটা দিনই আছে, যেদিন ওরা চিঠি লিখে... একদম সবাইকে আমি খোলাভাবে বলি যে, যার যেই আপনজনের কাছে হোক, তোমরা চিঠি লেখো... কেউ বাবার কাছে চিঠি লিখে, কেউ মায়ের কাছে, কেউ বন্ধুর কাছে, কেউ দাদুর কাছে (দাদুকে বুবু বলে ডাকে)... দাদুর কাছে চিঠি লেখে... এবং ভালো লাগার বিষয় কী... সেই চিঠিগুলো বাবা-মায়েরা (যখন বাড়িতে তাদের হাতে নিয়ে দেয়) পড়ে... তারা আমাকে ফোন করে, কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে, বলে যে, আমার বাচ্চা কোনদিনও আমাকে মুখে এই কথাটি বলেনি!

বাতিঘরের বাচ্চারা গান শিখে। যেমন তারা যেদিন গান শিখল... প্রজাপতি, প্রজাপতি... কোথায় পেলে ভাই এমনো রঙিন পাখা..., তার ঠিক আগের দিন ওরা বাইরে ঘুরতে গিয়েছিল, সেদিন তারা মাঠ... ঘুরে ঘুরে, প্রজাপতি আর ফড়িং ধরেছিলো... প্রজাপতি ধরেছে, ফড়িং দেখেছে, তার পরেরদিন ওদের গানের ক্লাস হলো... প্রজাপতি, প্রজাপতি... কোথায় পেলে ভাই এমনো রঙিন পাখা...। আমি দেখছিলাম যে, বাচ্চারা যখন গান গায়, তখন ওরা সামনে দেখতে পাচ্ছে একটা দৃশ্য (প্রজাপতি, প্রজাপতি... কোথায় পেলে ভাই এমনো রঙিন পাখা...)।

বাচ্চারা নাচ করে। নাচতো মনের আনন্দকে হাত পা নেড়ে প্রকাশ করার ভঙ্গি, সেই জায়গাটাতেই থাকতে চাই, এখনো পর্যন্ত...! খুউব dramatically এখনো আমি তাদের... চাই না যে, তারা কিছু করুক। তারা... সৃষ্টি সুখের উল্লাসে... নেচে যাক।

কোনো একটা ছেলে শাপলা ফুল আঁকল, সেই শাপলা ফুলটা নীল! আমাদের ভাবতে এতো ভালো লাগে যে, আমরা তো সবসময় সাদা দেখেছি, লাল দেখেছি, শিশুদের চিন্তাটা আসলে কত (!)... ওর কল্পনার জগৎটা (!)... ওরা শাপলাকে নীলও করে ফেলে। আমাদের এখানে কখনোই যেয়ে বলা হয় না যে, শাপলা লালই হতে হবে।

বাচ্চারা কথা বলতে ভয় পাবে না। বাচ্চারা অযৌক্তিক কথা বলবে না। যুক্তি দিয়ে কথা বলবে। এই জিনিসটা যেন ছোটবেলা থেকে তাদের ভেতরে গড়ে উঠে। সেজন্য তারা যুক্তিকথা করে।

আমি... একটা মেয়ের বয়ঃসন্ধিতে যে পরিবর্তনগুলো আসে, আমি মা হয়ে আমার ছেলেকে সেগুলো খুলে বলেছি। যখন আমার ছেলে আমার মুখ থেকে একটা মেয়েকে চিনবে এবং জানবে যে, আমার মা একটা মেয়ে, যা কিছু একটা বাইরের মেয়ের সাথে ঘটে তার সমস্তকিছু আমার মায়ের সাথেও ঘটে। আমি যা কিছু বাইরের একটা মেয়ের সাথে করব (খারাপ আচরণ), আমার মা যখন পথে বের হবে তখন বাইরের একটা ছেলেও হয়ত আমার মায়ের সাথে এই আচরণটাই করবে। এটা যখন সে বুঝবে তখন কিন্তু আমার সন্তান কখনোই বাইরে গিয়ে একটা মেয়ের সাথে তেমন আচরণ করবে না। সবকিছুর পরেও প্রধান কথা যেটা... পরিবর্তন, শিক্ষা যেটাই বলুন, শুরু করতে হবে আপনার ঘর থেকে।”

তামান্না সেতু: পরিচালক, বাতিঘর

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত