artk
১০ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, শনিবার ২৪ জুন ২০১৭, ৭:৫২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

আহমেদ রশিদ লালীর সাক্ষাৎকার
‘হুটহাট শেয়ার কেনা-বেচা থেকে বিরত থাকুন’

| নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ২০০১ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ১০ জানুয়ারি ২০১৭ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৩৪৪ ঘণ্টা, বুধবার ১১ জানুয়ারি ২০১৭


‘হুটহাট শেয়ার কেনা-বেচা থেকে বিরত থাকুন’ - বিশেষ সংবাদ

“গুজব বিশ্বের সব শেয়ারবাজারেই আছে। গুজব থাকবে। এটা থেকে বাঁচতে হলে শেয়ারবাজারের প্রতি সম্পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। হুটহাট শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। যেখান থেকেই তথ্য আসুক, সেটাকে যাচাই-বাছাই করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে তারপর শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। এক কথা নিজেকে পরিপক্ক করে শেয়ারবাজারে লেনদেন করতে হবে।” বিনিয়োগকারীদের এমন পরামর্শ দিয়েছেন আহমেদ রশিদ লালী। যিনি ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি।

লালীর মতে, শেয়ারবাজারের ইতিবাচক ধারা দেখে ‘বিনিয়োগ হারানোর কিছু নেই’ ভাবাটা বোকামি। শেয়ারবাজার ঝুঁকিপূর্ণ। এটি কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে বিনিয়োগ হারানো স্বাভাবিক। তাই বিনিয়োগ হারানো আগে পুঁজির নিরাপত্তা নিজেকেই করতে হবে।

সম্প্রতি ডিবিএ সভাপতি লালী নিউজবাংলাদেশের মুখোমুখি হন রাজধানীর মতিঝিলে তার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে। রশিদ ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান

ডিবিএ কী ধরনের কাজ করে থাকে?
আহমেদ রশিদ লালী: বিনিয়োগকারী, ব্রোকারহাউস, ডিএসই, বিএসইসিসহ সব মহলের কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যেতে ডিবিএ নিরলসভাবে শেয়ারবাজারে কাজ করে। পাশাপাশি বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ডিবিএ বাজার উন্নয়নের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কাজ সুসম্পন্ন করতে আমার কমিটি সবসময় তৎপর থাকে।

আপনার দৃষ্টিতে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি কেমন?
আহমেদ রশিদ লালী: শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির সব প্যারামিটার পজেটিভ। ফলে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার প্রতি আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর সুফল বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। অতীতের চেয়ে বাজারের স্বাস্থ্য এখন ভাল। এ স্বাস্থ্য সামনে আরো উচ্চতায় যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে বাজারের লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকায় যাবে।

কৃত্রিমভাবে বাজার ওঠানোর অভিযোগ পাওয়া যায়...
আহমেদ রশিদ লালী: কৃত্রিমভাবে বাজার ওঠানোর বিযয়টি সম্পূর্ণ বানোয়াট। কারণ বর্তমান বাজারে এই ধরনের কোনো সুযোগ নেই। যদি আপনারা জেনে থাকেন কে বা কারা কৃত্রিমভাবে বাজার ওঠাচ্ছে, তাহলে তাদের ধরিয়ে দিন। আমরা এখনই তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেব।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরেছে বলে কি মনে করেন?
আহমেদ রশিদ লালী: লেনদেন বৃদ্ধি দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আসলে বর্তমানে আমাদের বাজার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। এর পেছনে থাকা কারণগুলোর মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসা। দীর্ঘসময় শেয়ার দর তলানিতে থাকা। একটা শেয়ারের দর যখন তলানিতে থাকে তাকে আবার তার স্থানে ফিরে আসতেই হবে। এটা বাজারের ধর্ম। অনেক দিন আমাদের বাজারের শেয়ার দর নিচে অবস্থান করছিল। এখন তার অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে।

বাজারের উন্নয়নে আপনারা কী ধরনের পরিকাল্পনা নিয়েছেন?
আহমেদ রশিদ লালী: বাজারের উন্নয়ন স্বার্থে ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এরইমধ্যে বাজারের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের উন্নয়নের কাজ চলছে। যেমন- ডেরিভেটিভ মার্কেট গঠন, ইটিএফ নীতিমালা, স্মল ক্যাপ গঠন এবং আমাদের স্টক মার্কেটের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগকারী। শিগগিরই বাজার আরও সমৃদ্ধ হবে।

প্রণোদনা প্যাকেজ কি বিনিয়োগকারীদের কাজে লেগেছে?
আহমেদ রশিদ লালী: সরকারের দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজ ৯শ’ কোটি টাকা বিনিয়োগকারীদের কাজে লাগেনি। কারণ প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ সঠিকভাবে ও ঠিক পদ্ধতিতে আসেনি। প্রণোদনা প্যাকেজ আইসিবি যে প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের দিয়েছে, সেই প্রক্রিয়া ঠিক ছিল না। এখন প্রায় প্রণোদনা প্যাকেজের সোয়াশ’ কোটি টাকা বিতরণই হয়নি। এরইমধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বেড ঋণে পরিণত হয়েছে।

ইব্রাহিম খালিদের রিপোর্ট কটতা যৌক্তিক ছিল?
আহমেদ রশিদ লালী: ২০১০ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির যে রিপোর্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালিদ প্রকাশ করেছিল। আসলে সেটা কোনো রিপোর্ট ছিল না। সেটা ছিল তার মনগড়া গল্প। কারণ একজনকে আসামি করার আগে যথেষ্টা প্রমাণ দেখানো জরুরি। ওই রিপোর্ট ইব্রাহিম খালিদ কোনো যুক্তি বা কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। এক কথায় ওই রিপোর্ট ছিল তার ধারণা। আমি সেই রিপোর্ট বানোয়াট বলেই মনে করি। তাই আমার কাছে, এটা নবম শ্রেণির পাঠ্য বই।

অনেক কোম্পানি কর সুবিধা পেতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে...
আহমেদ রশিদ লালী: ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে সরকার কর সুবিধা দিচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক। তবে অনেক অনুপোযুক্ত কোম্পানি সেই সুবিধা পেতে শেয়ারবাজারে আসছে, সেটা আমি বাঁকা চোখে দেখছি। কারণ সরকার কর সুবিধা দিয়েছে শেয়ারবাজরের উন্নয়নের জন্য।

কোম্পানির আইন অমান্যকারীদের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
আহমেদ রশিদ লালী: ভালো কোম্পানি সবসময় কোম্পানি আইন মেনে চলে। কোনো কোম্পানি যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকে, তবে সেটা হবে দুঃখজনক। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আমরা কঠিন অবস্থানে আছি। বিএসইসি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দেশ রয়েছে।

বহুজাতিক কোম্পানি শেয়ারবাজারে না আসার কারণ কী?
আহমেদ রশিদ লালী: বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না কেন, সেটা বলা মুশকিল। তবে তাদের আসতে আমরা বরাবর আমন্ত্রণ জানাই। এটাও সত্যি যে আমাদের দেশে অনেক বড় কোম্পানি রয়েছে। সেগুলো বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার চেষ্টা চলছে। তাদের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে আসার প্রক্রিয়া আরো সহজ করার কথা চিন্তা করা উচিৎ। পাশাপাশি একই প্রস্তাব বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির বেলায় থাকাটা জরুরি।

অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না কেন?
আহমেদ রশিদ লালী: বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। শেয়ারবাজরে আসা নিয়ে তাদের কিছু ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সমস্যা অনেকেটা দূর হয়েছে। অনেক কোম্পানি আসার সম্মতি দিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
আহমেদ রশিদ লালী: বিনিয়োগকারীদের বলতে চাই, বর্তমান শেয়ারবাজার নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। এখন বাজার ভালোর দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আপনারা দৈনিক লেনদেন পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করুন। মার্জিন লোন পরিহার করে কোম্পানির অতীত ইতিহাস যাচাই বাছাই করে বিনিয়োগ করুন। মৌলভিত্তিক কোম্পানি দেখে বিনিয়োগ করুন। এ মুহূর্তে সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো খবর। শেয়ারবাজারের এই সুবাতাস ধরে রাখতে বুঝে, শুনে ও বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করুন। পেশাদারিত্বের পরিচয় দিন।

আহমেদ রশিদ লালী সম্পর্কে কিছু তথ্য
(ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ এক নির্বাচনের মাধ্যমে আহমেদ রশিদ লালীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। তিনি দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ডিএসইর একজন সদস্য হিসেবে শেয়ারবাজারের সঙ্গে জড়িত। এ বাজার উন্নয়নে তিনি সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আধুনিকায়নসহ বাংলাদেশের শেয়ারবাজার পুণর্গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। লালি ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে মে ২০০৮ পর্যন্ত ডিএসইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ফেব্রুয়ারি ২০০৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৬ পর্যন্ত ডিএসইর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০০০ থেকে মার্চ ২০০৩ পর্যন্ত ডিএসইর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া লালী আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জসমূহের সংগঠন সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে ডিএসইর যাত্রার শুরুতেই তার মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস ডিএসইর সদস্য পদ লাভ করে। পরে ২০০৬ সালে ডিএসইর কর্পোরেট সদস্য হিসেবে রসিদ ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিসেস লি. নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে তিনি ওই ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এটি ডিএসইর প্রাচীনতম এবং তৃতীয় প্রজন্মের ব্রোকার হাউস। দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন কনফারেন্স, সেমিনার ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে শেয়ারবাজার বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইউএসএসহ ইউরোপের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার স্ত্রী মিসেস তাসনীমা আফরোজ এবং ছেলে রাইস আহমেদ রশীদ।)

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএজেড/এমএ/এজে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য